শনিবার, ২৩ জুন, ২০১২

গিলানি ইস্যু এবং পাকিস্তানের গণতন্ত্র


 মুহাম্মদ রুহুল আমীন  

গত ১৯ জুন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরী সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের সদস্যপদে অযোগ্য ঘোষণা করে এক যুগান্তকারী রায় দেন। গিলানির প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ আদালতের রায়ে বাতিল হবার পর ক্ষমতাসীন পিপিপি জোট সাহাবুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পদে মনোনয়ন দানের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসে। কিন্তু হঠাত্ করে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার আদেশ জারি হয়। তার এই গ্রেফতারের ব্যাপারটি আন্দাজ করতে পেরেই সম্ভবত ক্ষমতাসীন জোট রাজা পারভেজ আশরাফকে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন করেন। কিন্তু শোনা যাচ্ছে তার বিরুদ্ধেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদটি অলংকরণে অনির্দিষ্টকালের জন্য চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করবে। এ রায়টি ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), জাতীয় পরিষদের স্পিকার, পার্লামেন্ট এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান ও শ্রেণীর স্বার্থ ও মতামতের পরিপন্থি হওয়ায় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে পাকিস্তানের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অনেকে আবার ‘ক্ষমতায় পৃথকীকরণ তত্ত্ব’ আলোচনাপূর্বক গিলানি ইস্যুকে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছেন।
১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ হতে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে একের পর এক অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা, সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য, রাজনীতিবিদদের নীতিচ্যুতি, পাকিস্তানের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে  বৈষম্যমূলক রীতি-নীতি দেশটিকে অগণতান্ত্রিক, নিষ্ঠুর এবং অমানবিক রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীতে দাঁড় করায়।
ইসলামের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তানে কখনো ইসলামী রীতি-নীতি অনুসৃত হয়নি; এমনকি জনগণের মধ্যেও সুখ, সম্পদ, সৌভাগ্য সমান ভাগ করে নেওয়ার ইসলামী বিধানের ন্যূনতমও পালিত হয়নি। আয়ুব, ইয়াহিয়া, জিয়াউল হক, পারভেজ মোশাররফ প্রমুখ সামরিক শাসকগণ বন্দুকের নলের মুখে শাসন ক্ষমতা দখল করে জনগণের অধিকার হরণ করে এবং স্বীয় স্বার্থে বিচার বিভাগকেও যথেচ্ছ ব্যবহার করে পাকিস্তানকে স্বৈরতন্ত্রের দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় পরিচিত করায়।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সম্প্রতি পাকিস্তানের গণতন্ত্র-যাত্রা অভিষিক্ত হওয়ার আগেই পারভেজ মোশাররফ আবার খড়গহস্ত হন এবং পাকিস্তানকে আবারো গণতন্ত্রহীনতায় নিক্ষেপ করেন। পারভেজ মোশাররফের সাথে প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরীর নানা মতপার্থক্য দিন দিন স্পষ্ট হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতিকে তার দায়িত্ব পালন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। রাজনৈতিক পালাবদলের বিপরীত হাওয়ায় পুনরায় তিনি প্রধান বিচারপতির আসনে উপবিষ্ট হন।
আদালত প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডে চিঠি পাঠানোর নির্দেশ দেন গিলানিকে, কিন্তু গিলানি যুক্তি দেখান যে, প্রেসিডেন্ট সংবিধান অনুযায়ী দায়মুক্তি ভোগ করেন এবং সে যুক্তিতে তিনি আদালতের আদেশ পালনে বিরত থাকেন। তখন গিলানিকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রতীকী শাস্তিও দেওয়া হয়। ইতিপূর্বে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদের স্পিকার ফাহমিদা মির্জা পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব তত্ত্ব উপস্থাপনপূর্বক গিলানির পক্ষাবলম্বন করেন। পরবর্তী সময়ে স্পিকারের রুলিংকে বৈধতা দিয়ে প্রস্তাব পাস করে সাধারণ পরিষদ।
স্পিকারের এ রুলিং চালেঞ্জ করে নওয়াজ শরীফের পিএমএলএন এবং ইমরান খানের তাহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ জুন গিলানির প্রধানমন্ত্রিত্ব ও পার্লামেন্টের সদস্যপদ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট রায় ঘোষণা করেন। নিঃসন্দেহে এ রায়টি পাকিস্তানের বিচার বিভাগ ও পার্লামেন্টকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকারী অংগ হলো শাসন বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। নির্বাহী ও আইন বিভাগের সাথে প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করে বিচার বিভাগ পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে নিপতিত করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। রায়টিকে পার্লামেন্টের প্রতি মারাত্মক চপেটাঘাত বলে তারা বিবেচনা করছেন। কারণ পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান ছিল গিলানির পক্ষে।
কোন কোন গবেষক সাম্প্রতিক রায়কে আদালতের অভ্যুত্থান হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে সেই অভ্যুত্থান সরাসরি সাংঘর্ষিক রূপ নিবে বলে মনে হয় না। রায় ঘোষণার পর পর ক্ষমতাসীন জোট তেমন কোন গ্রাসী তত্পরতা দেখায়নি; বরং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ব্যাপারে তাদেরকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী দেখা গেছে। আদালতের ছুঁড়ে দেওয়া উত্তপ্ত বলটি এখন স্বঘোষিত সর্বোচ্চ কর্তৃত্বসম্পন্ন পার্লামেন্টের কোর্টে থাকলেও পাল্টা মারের কোন পূর্বাভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক বাস্তবতা সত্ত্বেও ইউসুফ রাজা গিলানি স্বীয় দল, পার্লামেন্ট এবং অরাজনৈতিক অংগনে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৪৯৪ দিন ক্ষমতায় থেকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন গিলানি। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৫২৪ দিন ক্ষমতায় থেকে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্বৈরশাসন, সেনাশাসন, বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রভৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে তিনি দেশহিতৈষী নেতা হিসেবে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন। এমন এক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর ক্যারিয়ারে বিচারিক মার আমজনতাকে স্তম্ভিত করেছে। তাঁর অবর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর শূন্য পদে অন্য কারো গ্রহণযোগ্যতা খুব টেকসই হবে না বলে অনুমিত হচ্ছে। ফলে গিলানি ইস্যুটি পার্লামেন্টকে উত্তপ্ত রাখবে এবং অবধারিতভাবে পাকিস্তানে চরম রাজনৈতিক অশ্চিয়তা সৃষ্টি করবে।
সবচেয়ে মারাত্মক পরিণতি অপেক্ষা করছে আগামী দিনের রাজনীতিতে। ক্ষমতাসীন জোটের সামনে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই যে, তাদের মনোনীত পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীও একই ধরনের রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে পড়বেন না। দ্য ডন জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে পিপিপির উদ্বেগের এ অংশটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে তত্পর হয়েছে পিএমএলএন।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে রাজনীতির শ্বাপদসংকুল অরণ্যে বিচরণ করতে হবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। তিনি পিপিপির দলীয় প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারীর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে সুইজারল্যান্ডকে চিঠি দিবেন কিনা, দিলে পার্লামেন্ট ও দলের ভিতর কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, আর না দিলে বিচার বিভাগ গিলানির ন্যায় তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরী চাপিয়ে দিবে কিনা এ রকম নানা বিরক্তিকর পরিস্থিতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আনয়ন করবে। এরূপ পরিস্থিতিতে পিপিপির মধ্যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও প্রকট হতে পারে এবং এক পর্যায়ে বর্তমান পার্লামেন্ট ভেঙ্গেও যেতে পারে। এমনি অস্থিতিশীলতার সুযোগে অতীতের সকল সময়ের মত সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানে গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়ে পুনরায় স্বৈরতন্ত্র চেপে বসতে পারে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, এতসব অশনিসংকেত সত্ত্বেও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য শুভ সংবাদ হলো বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক নিষ্ঠা ও স্বাধীনতা আর যার অতন্দ্র প্রহরী হলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরী। দীর্ঘসময় ধরে সেনাশাসনের কদর্য ইতিহাসে পাকিস্তানের বিচার বিভাগ অতীতে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখেনি। বরং সেনাশাসনের বৈধতা দিয়ে বিচার বিভাগকে কলংকিত করা হয়েছে বার বার। তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ কেবল বিচার বিভাগ, সাধারণ জনগণের নির্ভরতা ও আস্থার শেষ আশ্রয়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব। বিচারপতি ইফতিখার সুদৃঢ়ভাবে সেই বিচার বিভাগীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অকপট ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট বলে মনে হয়।
প্রেসিডেন্ট জারদারীর বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিচারিক নির্দেশ, এ নির্দেশ অমান্য করায় স্পিকার ফাহমিদা মির্জা ও প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে তলব, প্রধানমন্ত্রীকে প্রতীকী শাস্তি প্রদান এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রিত্ব বাতিল করে আদালতের রায় প্রদান প্রধান বিচারপতি ইফতিখারের বিচারিক দৃঢ়তার পরিচয়বাহক।  ইতোপূর্বে প্রেসিডেন্ট জারদারীর সাথে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর দ্বন্দ্ব প্রকট হলে প্রেসিডেন্ট তাকে অপসারণ করেন। কিন্তু এর প্রতিবাদে প্রধান বিচারপতি এককভাবে প্রতি জেলার বারগুলোতে সভা করে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলে আদালতের রায় নিয়ে স্বপদে বহাল হন। ন্যায় বিচারের প্রশ্নে বিচারপতি ইফতিখার কোন আপোষে বিশ্বাসী নন, এমনকি বিচারের রায় যদি তার আপনজনের বিরুদ্ধেও যায়। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি নিজের ছেলের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি রুল জারি করে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তার ছেলে আরসালান ইফতিখার ও ধনাঢ্য রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ী মালিক রিয়াজ হোসেনের মধ্যে অবৈধ অর্থ লেনদেনের সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের একটি  বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করেন।
তবে ইফতিখার চৌধুরীর সাধুতা ও অকপটতাও প্রশ্নসাপেক্ষে। জারদারীর সাথে তার বৈরিতার কারণেই গিলানি ইস্যুতে প্রধান বিচারপতি কঠোর অবস্থানে গেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, সেনাবাহিনীর সাথে প্রধান বিচারপতির সখ্যতাও কম নয়।
এতসব জটিল সমীকরণে পাকিস্তানের গণতন্ত্র এক নাজুক অবস্থানে। বর্তমান পার্লামেন্ট ও নির্বাহী মিলে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক যাত্রার যে অভিঘাত রচনা করতে যাচ্ছিল, তা বিচার বিভাগের পাল্টা আঘাতে ভন্ডুল হতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর সাথে বিচার বিভাগের যৌক্তিক ও আইনগত দূরত্ব রক্ষার কৌশলের উপর। আর সেই দেশের সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের সাথে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আন্তঃক্রিয়ার ধরন ও প্রকৃতির উপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। তাহরিক-ই-ইনসাফ, পিএমএলএন-সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন দল এবং বিচার বিভাগের এ দ্বান্দ্বিক অবস্থাকে কিভাবে হ্যান্ডেল করবে তার উপরও নির্ভর করছে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্।
n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বৈষম্য ও বৈপরীত্যের দেশ


করাচির রাস্তায়ও দুই বিপরীত বাস্তবতা
করাচির রাস্তায়ও দুই বিপরীত বাস্তবতা
ছবি: লেখক
ইসরাত জাহান 

করাচির রাস্তায় সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে হাঁটছি আমরা ১০ বাংলাদেশি। দুপুরে মাত্র পা রেখেছি পাকিস্তানে। নানা প্রচারমাধ্যমের কল্যাণে আর অতীত অভিজ্ঞতায় মন আর মাথা ঠাসা ছিল নেতিবাচক অনুভূতিতে। সাংবাদিক হওয়ায় হয়তো নিজের অজান্তেই এসব পূর্বধারণাকে পাশে ঠেলে সবকিছু খোলামনে দেখার একটা আকাঙ্ক্ষাও ছিল। তার পরও সতর্ক ছিলাম—করাচি বলে কথা! হঠাৎ আমাদের দলেরই একজনকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু বলতে দেখে সবাই কী হলো, কী হলো করে উঠি। তাঁর দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাই। চোখে পড়ে দাড়ি-গোঁফওয়ালা এক পাকিস্তানি বৃদ্ধের হাসিমাখা মুখ। আমাদের সহযাত্রী জানান, বৃদ্ধ আমাদের দেখে উৎসুক অন্যদের বোঝাচ্ছিলেন, আমরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। সবাই তখন আমরা একযোগে বৃদ্ধকে বোঝাতে লেগে যাই: হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা বাংলাদেশি। 
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের আমরা এ দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। আমরা বাঙালি। যেখানেই যাই—এ আমাদের বড় অহংকার। কিন্তু পাকিস্তানি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, তারা জানেই না মুক্তিযুদ্ধে তাদের শাসকদের নৃশংসতার কথা, পরাজয়ের কথা। কিন্তু এখন যখন জানছে, প্রত্যেকেই ঘৃণা জানাচ্ছে শাসকদের এই কর্মকাণ্ডের প্রতি, প্রকাশ করছে লজ্জা। আজ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে শুধু দেশের ভেতরেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণের লড়াই করতে হচ্ছে তা না। করতে হচ্ছে বিশ্বে তাদের ভাবমূর্তি উন্নত করার লড়াইও। 
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে গত ১৬ মে আট দিনের সফরে দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমাদের ১০ জনের। প্রচারমাধ্যম নয়, স্বচক্ষে পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য। বাইরে থেকে হঠাৎ গিয়ে কোনো দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝে ওঠার সুযোগ থাকে খুবই সীমিত। এই সীমিত সুযোগ থেকেই যেমন পাকিস্তানি আতিথেয়তা, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, শহরাঞ্চলে নারীদের স্বচ্ছন্দ চলাফেরা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা নজর কাড়ে, তেমনি চোখে পড়ে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপরীত্য, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, নিরাপত্তার ঝুঁকি আর সামরিক শক্তির দিকেই শাসকদের মনোযোগের বিষয়টি। এখানকার প্রধান তিনটি নগরের পথে চলতে গিয়ে যেটুকু দেখা আর মাঝেমধ্যে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাই এ লেখার সম্বল। 
কোনো দেশের উন্নয়নে যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক, বেসামরিক সব শাসকই এই যোগাযোগব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। করাচি পাকিস্তানের পুরোনো শহর। তার পরও এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা এত ভালো যে করাচি বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ৭০-৮০ কিলোমিটারের মধ্যে যানজট তো দূরের কথা, একটা ট্রাফিক সিগন্যালের বাধাও আপনি পাবেন না। ছুটে চলা রাস্তায় কেবলই চোখে পড়ে প্রাইভেট কার আর মোটরসাইকেল। রয়েছে স্কুটার আর আমাদের মুড়ির টিনের মতো কিছু বাসও। এগুলোর জানালায় চোখে পড়ে দরিদ্র মানুষের মুখ। তবে করাচির কোথাও দেখবেন না এসব মানুষের বসবাস। শহরে এরা আসে জীবিকার তাগিদে। দিন শেষে ফিরে যায়। 
এটাও সত্য, কোনো বাসেই মানুষকে দাঁড়িয়ে বা ঝুলে যেতে দেখা যায় না। অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭০ লাখের মতো। আয়তন আট লাখ তিন হাজার ৯৪০ বর্গকিলোমিটার। আর শুধু করাচিতেই থাকে দেড় কোটির বেশি মানুষ। 
লাহোরের রাস্তায় করাচির সেই মুড়ির টিনের মতো বাস নেই। বরং চোখে পড়তে পারে নিরিবিলি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কোনো গাধা। এখানে শহর ঘিরে পাহাড় থাকায় পাহাড়ি পথে চলতে অভ্যস্ত গাধা বা ঘোড়া কখনো দুলকি চালে শহরের রাস্তায়ও নেমে আসে। ইসলামাবাদে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশকে দেখা গেল ব্যস্ত গাড়ির গতি অক্ষুণ্ন রাখতে। কদাচিৎ যদি কোনো সিগন্যালে গাড়ি থামে তবে তার জানালায় এসে হাত পাতে কঙ্কালসার চেহারার কোনো নারী বা শিশু। শহুরে পাকিস্তানিদের জীবনে এরা যেন বিচ্ছিন্ন আরেক জগতের মানুষ। অথচ দেশটির বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রামের (বিআইএসপি) হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে। এর মধ্যে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ আবার চরম দরিদ্র। 
করাচি, লাহোর আর ইসলামাবাদে ফুডস্ট্রিট বলে কয়েকটি রাস্তা আছে। এক নামেই সবাই চেনে এসব জায়গা। এখানে সন্ধ্যার দিকে নারী-পুরুষ ভিড় করে খোলা রাস্তায় মুক্ত বাতাসে আহার করতে। লাহোরে প্রথম একটি ফুডস্ট্রিট গড়ে তোলা হয়। পরে গড়ে তোলা হয় ইসলামাবাদ ও করাচিতেও। কোনো অনুষ্ঠান বা প্রাত্যহিক—দুই ধরনের প্রয়োজন থেকেই এখানে খেতে আসে মানুষ। বন্ধু, পরিবার, সন্তানসন্ততি নিয়ে দলবলে বা একা। ভোজনবিলাসী সচ্ছল মানুষেরা এখানে হইহুল্লোড় করে, আড্ডা দিয়ে ফেরে ঘরে। 
ইসলামকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ তাদেরই রাস্তায় প্রকাশ্যে দেখা যায় বিশাল বিলবোর্ডে বিয়ারের বিজ্ঞাপন। যে ভারতের সঙ্গে রেষারেষি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাজেটের মূলভাগ ব্যয় করে সমরাস্ত্রের পেছনে, বাড়িয়ে চলে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষমতা, সেই ভারতীয় সিনেমা আর স্যাটেলাইট চ্যানেলের ব্যবসা এখানে রমরমা। এখানে মানুষ কাজ শেষে নাইট শোতে দেখতে যায় সিনেমা হলে চলা ভারতীয় সিনেমা। 
করাচির রাস্তায় পা রেখে শুরু হয়েছিল পাকিস্তান দেখা। পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগর হিসেবে করাচির যে পরিচিতি, সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কিয়াম আলী শাহর কাছে। 
১৮ মে তিনি নিজ বাসভবনে বসে সফরকারী দলটিকে বলেন, ‘দেখুন, করাচিতে দেড় কোটি মানুষের বাস। আয়তন ও জনসংখ্যার এই অনুপাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কোনো শহরের সঙ্গেও তুলনা করেন, তবে করাচির অবস্থা অনেক ভালো।’ শহরটির অনেক প্রবীণ সাংবাদিকও মনে করেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এগুলো পশ্চিমা বিশ্বের উদ্দেশ্যমূলক ‘মিথ্যা প্রচারণা’। মুখ্যমন্ত্রী কিয়াম আলী শাহ সেদিন আরও দাবি করেছিলেন, করাচির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অথচ ২৪ মে আবার করাচির বুক হয়েই আমরা যখন ফিরছি, জানতে পারলাম শহরটিতে হরতাল। তাই নিরাপত্তার খাতিরে স্থানীয় পিআইএর হোটেলেই সারা দিন বসে থাকতে হলো। সেখানেই চলে নানাজনের সঙ্গে গল্পগুজব। তারা আমাদের জানায়, বেলুচরা এসেছিল। তারেক রোডে কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়েছে। তাই হরতাল। মনে পড়ে, এই সেই ‘তারেক রোড’, যেখানে বৃদ্ধ পাকিস্তানি প্রথম দিন আমাদের ভাই বলে ডেকেছিলেন। 
ইসরাত জাহান: সাংবাদিক।

পারস্পরিক অপরিহার্যতাই পাক মার্কিন মৈত্রীর নেপথ্য শক্তি


এম আবদুল হাফিজ
২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন ওই পদে থাকা অব¯’ায় শেষবারের মতো সিনেট আর্মড ফোর্সেস কমিটির মুখোমুখি হন। সেখানে তার বক্তব্যে তিনি অশিষ্টভাবে পাকিস্তানের সমালোচনা করেন। তিনি কমিটিকে স্পষ্টই বলেন, উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠনগুলো কার্যত সেখানকার সরকারের হয়েই আফগান সৈন্য এবং বেসামরিক লোকজনসহ মার্কিন সৈন্যদের ওপরও হামলা চালিয়ে যা”েছ। হাক্কানি নেটওয়ার্ক সম্বন্ধে তিনি বলেন, ওটি আসলে গোয়েন্দা সং¯’া আইএসআইরই একটি কৌশলগত শাখা। মুলেন প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী এ নেটওয়ার্ক ২০১১ সালের জুন মাসে কাবুলের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আক্রমণ চালায়। অতঃপর বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়ার্দাক প্রদেশে ট্রাক-বোমার হামলা এবং সে মাসেই কাবুলে মার্কিন দূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। 
এত কিছু বলার পরও মুলেন প্রত্যাশিত উপসংহারে আসেননি। পাকিস্তানের বির“দ্ধে এমন একগাদা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মুলেন একথা বলা থেকে বিরত থাকেন যে, ‘পাকিস্তানকে একটি বৈরী শক্তি হিসেবে শনাক্ত করা হোক’। বরং মুলেনের সাক্ষ্য-প্রমাণের ক’দিন পর আবার আগের মতো পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই তাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে তথাকথিত সহযোগিতা বা তার ভান করতে স্ব স্ব ভূমিকায় ফিরে যায়। অর্থাৎ কেউ কাউকে বিশ্বাস না করেও আগের মতো পরস্পরের ‘সহযোগিতা’ করতে থাকে। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র জানে, পাকিস্তান ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই। যেমন পাকিস্তানও জানে যে, যতই অপ্রিয় হোক মার্কিন সাহায্য ছাড়া তারা অচল। 
যুগ যুগ ধরে মার্কিনিরা পাকিস্তানি সাহায্যকে খরিদ করেছে। শুধু এক-এগারোর পরই পাকিস্তানকে প্রদত্ত মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার। এটাই শুধু পাকিস্তানি সহযোগিতার মূল্য নয়, সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অজস্র প্রশংসায় ধন্য করেছে। ২০০৭ সালে মুলেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফে নিয়োগ পাওয়ার পর ইসলামাবাদে তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানকে ‘অটল ঐতিহাসিক মিত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০০৮ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস পাকিস্তান সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি দেশ যা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তো দূরের কথা, বরং যেখানেই সন্ত্রাসের গন্ধ পাওয়া যায়, সেখানেই এই দানবের বির“দ্ধে লড়ে আসছে। 
ইত্যবসরে মার্কিন নেতৃত্ব পাকিস্তানি নেতৃত্বের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় অনানুপাতিক সময়ও ব্যয় করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটন ভারতে দু’বারের বিপরীতে চারবার পাকিস্তান সফর করেছেন। অ্যাডমিরাল মুলেন বিশ বিশবার পাকিস্তানে এসেছেন। এতদসত্ত্বেও পাকিস্তানের বির“দ্ধে কুৎসায় মুলেনই প্রথম ব্যক্তি নন এবং তিনি ওই ভূমিকায় সর্বশেষও হবেন না। ২০০৮ সালে সিআইএ কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলার জন্য পাকিস্তানকে দেষী করেছিল। ২০১১ সালে এবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের আস্তানায় নেভি সিলস কমান্ডোদের হামলার মাত্র দু’মাস পর অ্যাডমিরাল জেম্স্ উইন ফিল্ড জয়েন্ট চিফসের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সিনেটের আর্মড ফোর্সেস কমিটিতে সাক্ষ্য দানকালে পাকিস্তানকে অত্যন্ত জটিল পার্টনার বা সহযোগী বলেছিলেন। ওই বছরেই হিলারি ক্লিনটন এক সংবাদ সম্মেলনে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের উপ¯ি’তিতে বলেছিলেন, ওবামা প্রশাসন পাকিস্তানিদের জোর-ধাক্কা দিয়ে সহযোগিতায় সক্রিয় করতে চেয়েছিল। তাই তা ফল বয়ে আনুক বা না আনুক, ওয়াশিংটনের পাকিস্তানকে সমালোচনা এবং সঙ্গে কিছু সাহায্যের থলি আসলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কৌশলের অংশ, কিš‘ সে কৌশল সামান্যই সফল হয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সমালোচনায় পাকিস্তানে কোন কাজ হয় না, কারণ ইসলামাবাদের নেতারা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রই যে পাকিস্তানকে ভয় করে, এর কিছু ঘটনা অজ্ঞাত থাকেনি। মার্কিনিদের বিশ্বাস, পাকিস্তানি নীতি সাহায্যকারী না হলেও তা আরও খারাপ হতে পারত। ওয়াশিংটন এক রকম ধরেই নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সঙ্গে না রাখলে এবং ইসলামাবাদ আফগানিস্তানে সব সহযোগিতা বন্ধ করে দিলে সেটা হবে মার্কিনিদের সন্ত্রাস প্রতিরোধ যুদ্ধের সমাপ্তি। 
আরও সমস্যা যেÑ যেমনটা চলমান ভাবনায় প্রকাশ পায়Ñ বাইরের কোন সাহায্য-সমর্থন ব্যতিরেকে রাষ্ট্র হিসেবে নড়বড়ে পাকিস্তানের ভেঙে পড়ার আশংকা। এমন অব¯’ার উদ্ভব হলে ইসলামাবাদে একটি উগ্রবাদী শাসনের আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তা যদি হয়, স্বভাবতই সেক্ষেত্রে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী তো দূরের কথা, উভয়ের মধ্যে ক্ষীণতম সংযোগের সুযোগও হয়তো থাকবে না। আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট কারজাই সরকারের সঙ্গেও হয়তো পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে সমগ্র অঞ্চলে অ¯ি’রতা ছড়িয়ে পড়বে। এমন অব¯’া এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থকে ক্ষুণœ করবে। শুধু তাই নয়, ইসলামাবাদকে উগ্রবাদীদের হাতে পড়তে দিলে এমনকি একটি পারমাণবিক যুদ্ধ অন্তত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত হতে পারে। 
পাকিস্তান-মার্কিন মৈত্রী সমস্যা সংকুল হলেও এর অর্জনও কিš‘ একেবারে নগণ্য নয়। এতদিন ধরে পাকিস্তানই তো মার্কিন সৈন্যদের জন্য রসদ সামগ্রী পাকিস্তানি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে সরবরাহের সুযোগ দিয়েছে। এখন ন্যাটো না হয় মধ্য এশিয়া ও র“শ বদন্যতায় বিকল্প সরবরাহের পথ খুঁজে পেয়েছে। কিš‘ নয়-এগারোর প্রথম প্রহরে পাকিস্তানই ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অনুকূলে সরবরাহ পথ দেয়া ছাড়াও অনেক মূল্যবান ভূমিকা রেখেছে। অনেক শীর্ষ আল কায়দা নেতাকে পাকড়াও করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ মার্কিনিদের হাতে তুলে দিয়েছে। নয়-এগারোর একজন পরিকল্পক খালিদ শেখ মুহম্মদকে পাকড়াও করতে পাকিস্তানের অবদান আছে। এছাড়া আফগানিস্তানে ড্রোন হামলার সূত্রপাতই হয়েছিল বেলুচিস্তানে পাকিস্তান প্রদত্ত ঘাঁটি থেকে। 
তবু পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্যের সব অবদানই ম্লান হয়ে যায়, যখন অনেক বিষয়েই পাকিস্তানের জেদি অসহযোগিতা বিবেচনায় আনা হয়। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের দুর্নাম হয়েছে বিশ্বে সর্বাপেক্ষা মারাÍক পরমাণু বিস্তারের হোতা হিসেবে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তথাকথিত এ কিউ খান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় অর্থের বিনিময়ে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাচার করেছে বলে অভিযোগ আছে। 
পাকিস্তান আল কায়দা, তালেবান ইত্যাদি জঙ্গিগোষ্ঠীর বির“দ্ধাচারণ করলেও হাক্কানি নেটওয়ার্কসহ আফগান-তালেবান এবং হিজবে ইসলামীর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে প্রকাশ্যে না হলেও সমর্থন করে। কারণ তাদের দিয়ে ভারতকে এবং কোয়ালিশন সেনাদেরও সন্ত্রাসী চাপে রাখা যায়। অনেক পাকিস্তানি কর্মকর্তা আবার ড্রোন হামলাকে উৎসাহিতও করে। তবে একাধিক কারণে বিন লাদেন হত্যা এবং পাকিস্তানি সার্বভৌমত্ব লংঘন করে মার্কিন কমান্ডোদের হেলিকপ্টারে পাকিস্তানে প্রবেশের ঘটনায় পাকিস্তানিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, যার জের এখনও চলছে। সিআইএ’র চর রেমন্ড লাহোরে দুই পাকিস্তানিকে হত্যা করা সত্ত্বেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণকে ঘিরে পাকিস্তানিদের মধ্যে অনেক অসন্তোষ আছে। সর্বোপরি পাকিস্তানেরই অংশ উপজাতীয় অঞ্চলে নির্বিচার মার্কিন ড্রোন হামলা এবং তাতে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু পাকিস্তানে এক প্রচণ্ড মার্কিনবিরোধী অনুভূতি সৃষ্টি করেছে, যা অব্যাহত আছে। 
তা সত্ত্বেও সব দিক বিচার করে পাক-মার্কিন মৈত্রী টিকে থাকবে। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে পাকিস্তান যখন প্রথম আঙ্কল স্যামের আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছিল, সেই থেকেই পাক-মার্কিন সম্পর্কে অনেক চড়াই-উৎরাই এসেছে এবং সেসব মোকাবেলা করেই আজও দু’দেশের মৈত্রী অনেক বিতর্কিত হয়েও টিকে আছে। এবং এই দীর্ঘদিনে উভয় দেশই পরস্পরের প্রতি এতটাই আসক্ত যে, যতই নড়বড়ে হোক একটি মৈত্রী বন্ধন পরস্পরের স্বার্থেই টিকে থাকবে। সন্ত্রাস মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানি ভূখণ্ড ও সামরিক বাহিনী যেমন প্রয়োজন, তেমনি লুটেপুটে খাওয়া এক কংকালসার পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য একইভাবে দরকার মার্কিন সাহায্য ।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশ



এডভোকেট ফিরোজ আহমেদ :
 আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর প্রচারিত সংবাদে মিয়ানমারে দাঙ্গায় রোহিঙ্গাদের নদীপার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ এবং আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সে অনুপ্রবেশ রোধ করে আবার পুশব্যাকের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা এও জেনেছি মানবিক কারণে এসব শরণার্থীদের পুশব্যাকের পূর্বে বাংলাদেশ খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে, এমনকি যে যন্ত্রচালিত নৌকায় নদী পার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিল, সেই যন্ত্রচালিত নৌকার জ্বালানি না থাকলে জ্বালানি সাহায্যও প্রদান করা হচ্ছে। জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের সর্বত্র রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণের বর্বরতার ছবির ফুটেজ প্রচারিত হচ্ছে, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয় স্পর্শ করার জন্য। হয়ত একইভাবে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকাতেও প্রচার চলছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত যেমনটি আমাদের দেশের শরণার্থীদের তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছিল, তেমনিভাবে আমাদেরও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া উচিত। গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আমাদের দেশে চট্টগ্রাম এলাকায় শরণার্থী হিসাবে আছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ত্রাণ কাজে এনজিওদের বাণিজ্যের অভিযোগ, জঙ্গি কানেকশন, নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত-এসব অভিযোগ বিদ্যমান। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রি ডা. দিপু মনি বাংলাদেশের এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এদের বাংলাদেশ শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় দেবে না এবং এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী রাজনীতি করছে।
রোহিঙ্গারা পূর্বতন বার্মা বর্তমান মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়। প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্য নামে নামকরণ করা পূর্ববর্তী আরাকান রাজ্যের ৩টি টাউনশিপে বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার হয়ে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা বর্তমানে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় ১৪৩০ থেকে ১৫৩১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বার্মা গৌড় সালতানাতের পরোক্ষ শাসনাধীন ছিল, সে সময়ে ঐ অঞ্চলে মুসলমানদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। আরাকান রাজারা যদিও ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন, তবুও সালতানাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তারা মুসলিম পদবী ধারণ করতেন। এই রাজবংশের দ্বাদশ রাজা শাহ্ পদবীধারী রাজা মিনবিন এর মোগল সম্রাট হুমায়ুনের বাংলা আক্রমণকালীন সময়ে অস্থিরতার সুযোগে তৎকালীন পূর্ববাংলার বিশাল অংশ দখল করে নেয়। ফলে চট্টগ্রামসহ আরাকান রাজ্যের সংস্কৃতি ও রীতিনীতিতে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব সৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন সপ্তম শতকে আরাকানে আসা পার্সিয়ান বণিকদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয় এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানরা ধীরে ধীরে রোহিঙ্গা হিসাবে পরিচিত ও আত্মিকৃত হয়ে পড়ে। ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশ আরাকান দখল করে নিলে ভারত ও বাংলার সঙ্গে বার্মার যোগাযোগ বেড়ে যায়। বনজ সম্পদ আহরণ ও অন্যান্য কাজে বহু বাঙালি বার্মায় ভাগ্য অন্বেষণে গমন করে। ঐ অঞ্চলে দাঙ্গার ইতিহাস পুরনো। ১৯৪২ সালে ২৮ মার্চ রাখাইন অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা হত্যা করে রাখাইনরা। পাল্টা প্রতিশোধ রোহিঙ্গারা প্রায় ২০ হাজার রাখাইনদের হত্যা করেছিল। ১৯৪৫ সালে কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলায় চলে আসে। সে সময়ে মিয়ানমারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আলাদা রাজ্য গঠন করে দেবে ব্রিটিশের এই প্রতিশ্রুতির কারণে ব্রিটিশকে সমর্থন করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ে আসবার চেষ্টা করে।  এমনকি রোহিঙ্গারা সশস্ত্র গ্রুপও গঠন করেছিল। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সেই সময় থেকেই রোহিঙ্গাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রিয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।  ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যে নাগরিক আইন পাস করে তাতে মিয়ানমারে বাস করা ১৩৫টি গোত্রভুক্ত মানুষকে নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু রোহিঙ্গাদের গোত্র হিসাবে অস্বীকার করে সামরিক সরকার। সামরিক সরকারের বক্তব্য ছিল এরা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া অবৈধ জনগোষ্ঠী। এমনকি সহযোগী ও অভিভাষী নাগরিক হিসাবেও রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করা হয়। ১৯৮৯ সালে মিয়নমারে তিন ধরনের যে নাগরিক কার্ড প্রদান করা হয় তা থেকেও বঞ্চিত করা হয় রোহিঙ্গাদের। এই কার্ড চাকরি, ব্যবসা বাণিজ্য, পড়াশুনা, চিকিৎসা ইত্যাদি সুযোগ সুবিধায় কার্ড আবশ্যক থাকায় রোহিঙ্গারা এই সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধন বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার সরকার। শুধুমাত্র মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনীর খাতাতে রোহিঙ্গাদের নাম লেখা থাকে। বলা চলে রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামে এক ধরনের কারাগারে বন্দি হিসাবে বাস করছিল, নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে তাদের ট্রাভেল পাস নিতে হত। ১৯৯০ সালে আরাকান রাজ্যে যে স্থানীয় আইন জারি করা হয় তাতে রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন এবং ২ সন্তানের অধিক সন্তান নেয়া যাবে না এ রকম মুচলেকা প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০১ সালে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ থেকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয়। তখন ঘরে বসে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো রোহিঙ্গারা। ২০০৫ সাল থেকে সেই অধিকারটুকুও বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার জান্তা। ১৯৭৪ সালে ইমার্জেন্সি ইমিগ্রেশন এ্যাক্টে মিয়ানমারে নাগরিক কার্ড বহন করা বাধ্যতামূলক করা হয়, কিন্তু রোহিঙ্গাদের নাগরিক কার্ড দেয়া হয় না। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের উপর অপারেশন নাগামিন বা ড্রাগন রাজের নামে ব্যাপক অত্যাচার চালায় তাতে ২ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৯৯০ সালে রোহিঙ্গাদের সমস্ত নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত হলেও তাদের নির্বাচনের ভোটাধিকার দেয়া হয়। এই নির্বাচনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় অং সাং সূচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এন এল ডি) বিজয়ী হয়। কিন্তু সামরিক জান্তারা সূচির হাতে ক্ষমতা ছাড়তে রাজী না হওয়ায় মিয়ানমার জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ আর বিক্ষোভ। ২১টি এথনিক গ্রুপ নিয়ে গঠিত হয় ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স অব বার্মা বা ড্যাব। ড্যাব ঘোষণা করে সামরিক সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনতে তারা সশস্ত্র যুদ্ধ করবে। রোহিঙ্গাদের দুটি সংগঠন অল বার্মা মুসলিম ইউনিয়ন ও আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট ড্যাব কে সমর্থন জানায়। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জনরোষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পর্যবসিত করতে আক্রমণ শুরু করে রোহিঙ্গাদের উপর। রাখাইনদের উস্কে দেয়া হয়। এই সময় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ২য় দফা আগমন ঘটে বাংলাদেশে। ১৯৯২ সালে ২৮ এপ্রিল মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে থেকে যায়। ১৯৯৫ সালের মধ্যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠাবার কথা থাকলেও মিয়ানমারের অসহযোগীতায় তা হয়ে ওঠেনি। রোহিঙ্গা সমস্যা কোন সাময়িক বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে আসা এথনিক ক্লিনজিং এর অংশ। মিয়ানমার সরকার ২০ লাখ রোহিঙ্গার দায় বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। এটা সত্য যে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ভাষা, ধর্ম, নৃতাত্বিক গঠনে চট্টগ্রাম আদিবাসীদের মিল আছে। শুধুমাত্র একারণে শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য গ্রহণ করা কঠিন। বিষয়টি মানবিক স্পর্শকাতর ও কষ্টদায়ক। বাংলাদেশকে তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক কাজ করতে হবে, যাতে করে রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে নাগরিকের সম্মান পায় এবং অত্যাচারের কারণে নিজ দেশ ত্যাগ না করে। অস্ত্রের জোরে মিয়ানমারের জান্তা গণতন্ত্রকে পদদলিত করছে, রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলব-৮০ লাখ বাঙালি শরণার্থীকে ভারতবর্ষে পাঠিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে স্তব্ধ করা যায়নি। রোহিঙ্গাদেরও দেশ ত্যাগে বাধ্য করে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক স্রোতধারাকে রোধ করা যাবে না। আর আমরাও ৭১ এর বেদনাদায়ক স্মৃতিকে বহন করে চলেছি, তাই রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও মমত্ববোধকেও সমুন্নত রাখতে হবে।

মিয়ানমারে দাঙ্গা ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি


তারেক শামসুর রেহমান
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাখ্যান করেছে বটে। কিন্তু কেন প্রত্যাখ্যান করল, তা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। জাতিসংঘে বিষয়টি প্রয়োজনে তুলতে হবে জোরালোভাবে। কিছু মুসলিম দেশ রয়েছে, যারা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। তাদের বোঝাতে হবে, এখানে 'মানবতা' কোনো বিষয় নয়, বিষয় 'রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা'। সেই সঙ্গে দ্রুত মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে 'সংলাপ' শুরু করা উচিত

মিয়ানমারে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা পুনরায় জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়েছেন। দলে দলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী, যারা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত, তাদের পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সঙ্গত কারণেই এসব রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করতে পারে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এ ব্যাপারে একটি বিবৃতিও দিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ভূমিকা একটা প্রশ্নের মাঝে থেকে যাবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন যখন মিয়ানমারের দরজা পশ্চিমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন, যখন বিরোধী নেতা অং সান সু চি বিদেশ ভ্রমণে রয়েছেন, তখন নতুন করে এই জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলো কেন? পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়টি কীভাবে দেখছে, সেটাই আমাদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বলা প্রয়োজন, নতুন করে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক স্থান পেয়েছে। যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে, সে রকম একটি প্রতিষ্ঠান, নিউইয়র্কের ঙঢ়বহ ঝড়পরবঃু ঋড়ঁহফধঃরড়হ-এর গত ১৪ জুনের এক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়টি স্থান পেয়েছে। এমনকি অং সান সু চি যখন জেনেভায় (১৪ জুন), তখন তাকেও সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় সু চির ওই বক্তব্য ছাপা না হলেও বিদেশি মিডিয়ায় তা ছাপা হয়েছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে সু চি অনেকটা সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিলেন। যেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের, যাদের মধ্যে ৩ মাসের শিশু পর্যন্ত রয়েছে, তাদের যখন নিজস্ব বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়, তখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি একটিবারের জন্যও এর নিন্দা করলেন না। আমাদের শোনালেন সেই পুরনো 'কাহিনী', বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন। বিদেশি মিডিয়ায় তার বক্তব্য ছাপা হয়েছে এভাবে_ 'ডব যধাব ঃড় নব াবৎু পষবধৎ ধনড়ঁঃ যিধঃ ঃযব ষধংি ড়ভ পরঃরুবহংযরঢ় ধৎব ধহফ যিড় ধৎব বহঃরঃষবফ ঃড় ঃযবস.' অর্থাৎ পরোক্ষভাবে বলার চেষ্টা করলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন! সরাসরি তিনি এ কথাটা বলেননি বটে, কিন্তু তার বক্তব্যে পরোক্ষভাবে এ কথাটিই ফুটে উঠেছে। তিনি সহিংস ঘটনাবলির নিন্দাও করেননি।
এখানেই এসে যায় মূল বক্তব্যটি_ মিয়ানমারের নেতৃত্ব সেখানে এক ধরনের 'বৌদ্ধরাজ' প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এ প্রক্রিয়া তারা যে আজকেই শুরু করেছে, তা নয়। এই মানসিকতা তাদের দীর্ঘদিনের; মিয়ানমার শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রই হবে, সেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্থান হবে না। মিয়ানমারে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই বসবাস করে না। সেখানে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কারেন, কাচিন কিংবা শান জাতিও যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে, যাদের মধ্যে খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বীও রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের নেতৃত্ব এই দেশটিকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায়। অথচ পরিসংখ্যান বলে, ৬৪ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর এই দেশটিতে প্রায় ১৩৫টি ছোট-বড় নৃগোষ্ঠী রয়েছে। বড় এবং প্রভাবশালী নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও জাতিরাষ্ট্রের দাবিতে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। কারেন কিংবা শান জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগ্রামের খবর পত্রপত্রিকায় ছাপা হলেও রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা কোনো সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছে তেমনটি শোনা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে 'হারকাত উল জিহাদ-ই-ইসলামী' নামক একটি বাংলাদেশি মৌলবাদী সংগঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যারা রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ওই সংগঠনটিকে ২০০৫ সালে নিষিদ্ধ করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য সংসদে জামায়াতে ইসলামীর কথা উল্লেখ করেছেন, যারা রোহিঙ্গাদের উস্কানি দিচ্ছে বলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একটি বন্ধু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক সংগঠন সশস্ত্র উস্কানি দেবে, তা কাম্য হতে পারে না।
ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত। এক সময় আরব বণিকরা এ অঞ্চলে এসে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা যাবে না। প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে। ১৯৭৮ সালে ব্যাপক হারে উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসতে ও বসবাস করতে বাধ্য হয়। পরে ১৯৯১ সালেও দ্বিতীয় দফায় আরও বেশ কিছু রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকায় এসে আশ্রয় নেয়। সরকারিভাবে ২৮ হাজার রোহিঙ্গা রেজিস্ট্রিভুক্ত করা হলেও ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় দু'লাখ অবৈধ রোহিঙ্গা বর্তমানে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করছে। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন সরকারের মতো অং সান সু চি ও তার দল এনএলডিও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এনএলডি রোহিঙ্গাদের অভিহিত করেছে 'বাঙালি টেররিস্ট' হিসেবে।
আজকে মিয়ানমারের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান নব্বইয়ের দশকে বসনিয়া-হারজেগোভিনার জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের মার্চে বসনিয়ার জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার পক্ষে গণভোটে রায় দিলে সেখানে সার্বিয়ার উস্কানিতে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান চলে। শতকরা ৪৩ ভাগ মুসলমান জনগোষ্ঠী হত্যা, ধর্ষণ ও উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়। এই দেশটিকে সার্বিয়া একটি আশ্রিত রাজ্য বানাতে চেয়েছিল। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধে ১৯৯৪ সালের মার্চে ন্যাটোর বিমানবহরকে সার্বীয় অবস্থানের ওপর বিমান হামলা পর্যন্ত চালাতে হয়েছিল। আজ এত বছর পর সেই সার্বীয় গণহত্যাকারীদের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হচ্ছে। বৃহৎ পরিসরে দেখলে বসনিয়ার সেই পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কোনো পার্থক্য খুঁজে পাই না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মুসলমানরা উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হচ্ছে এবং রাখাইন রাজ্যটি ধীরে ধীরে একটি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের কোনো নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি সব ধরনের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। এখানে আরও একটি বৈসাদৃশ্য আমাদের চোখে পড়ার কথা। যেখানে বসনিয়ায় ন্যাটোকে এক পর্যায়ে বিমান হামলা চালাতে হয়েছিল, সেখানে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্ব নীরব। বরং উল্টো বাংলাদেশকে সীমান্ত খুলে দেওয়ার 'চাপ' পর্যন্ত দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিয়েছে। বাংলাদেশ এমনিতেই জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। বাংলাদেশ আর অতিরিক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। সুতরাং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশন প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যত্র, এমনকি ইউরোপে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে ইতিমধ্যে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গারা নানা রকম অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। তারা ইতিমধ্যে কক্সবাজার এলাকার ব্যাপক বনাঞ্চল ধ্বংস করেছে।
আমরা নতুন করে আরেকটি 'সমস্যা' দেখতে চাই না, যেখানে বিদেশি দাতা সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত আমাদের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলানোর সুযোগ পাক। এখানেই এসে যায় রিয়েল পলিটিক্সের প্রশ্নটি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাখ্যান করেছে বটে। কিন্তু কেন প্রত্যাখ্যান করল, তা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। জাতিসংঘে বিষয়টি প্রয়োজনে তুলতে হবে জোরালোভাবে। কিছু মুসলিম দেশ রয়েছে, যারা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। তাদের বোঝাতে হবে, এখানে 'মানবতা' কোনো বিষয় নয়, বিষয় 'রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা'। সেই সঙ্গে দ্রুত মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে 'সংলাপ' শুরু করা উচিত। আমাদের স্বার্থেই মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে নয়।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

শুক্রবার, ২২ জুন, ২০১২

পাকিস্তান কি সত্যিই একটি ‘ব্ল্যাক হোল’



তা রে ক  শা ম সু র  রে হ মা ন
পাকিস্তান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, উভয়দলীয় নেতারা মন্তব্য করেছিলেন যে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘ব্ল্যাক হোলে’র মতো। অর্থাত্ তারা যা বলতে চেয়েছেন, তা হচ্ছে পাকিস্তান যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ-ই স্পষ্ট করে বলতে পারছে না। এটা সেই ‘ব্ল্যাক হোল’ এর মতো, যার কোনো শেষ নেই। 
মার্কিন কংগ্রেসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদলীয় গ্রে অ্যাকারম্যান কিংবা রিপাবলিকানদলীয় ড্যানা রোহরাব্যাচারের মতো ব্যক্তিত্ব যখন পাকিস্তান সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করেন, তখন পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ নিয়ে উত্কণ্ঠিত না হয়ে পারা যায় না। মার্কিন আইন প্রণেতারা এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন গত মে মাসে কংগ্রেসের মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একটি প্যানেলে আমন্ত্রিত হয়ে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এই মন্তব্য যখন ওয়াশিংটনে নীতিনির্ধারকদের চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, ঠিক তখনই আরও একটি ‘বোমা ফাটালেন’ পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মোহাম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পূর্ণ বেঞ্চ। গত ১৯ জুন এক রায়ে তারা প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। এমনকি সংসদ সদস্যপদেও তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আদালত এই রায় দেন। পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন অবৈধ। প্রধান বিচারপতি চৌধুরী তার রায়ে উল্লেখ করেন, বিচারকদের সাত সদস্যের বেঞ্চ ২৬ এপ্রিল গিলানিকে সংবিধানের ২০৪(২) ধারা অনুযায়ী আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। প্রতীকী সাজা দিয়েছিলেন বিচারকরা। ৩০ সেকেন্ড কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন গিলানি। কিন্তু রায়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপিল নথিভুক্ত না হওয়ায় তিনি সংসদ সদস্যপদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, অন্যদিকে খোদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘তালেবানি’ তত্পরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। আগের চেয়ে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা পাকিস্তানের ব্যাপারে সোচ্চার। প্রকাশ্যেই তারা বলছেন গত দশক ধরে দেশটিকে দেওয়া ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা কোনো কাজেই লাগেনি। মার্কিন কংগ্রেসে এমন কথাও উঠেছে যে, পাকিস্তানে সব ধরনের সাহায্য বন্ধ করে দেয়া উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান সম্পর্কে যখন এ ধরনের একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে, ঠিক তখনই গিলানিকে অযোগ্য ঘোষণা করলেন উচ্চ আদালত। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান স্পষ্টতই একটি গভীর সঙ্কটে পতিত হল।
কী হতে যাচ্ছে এখন পাকিস্তানে? সেখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সিনিয়র নেতা মখদুম শাহাবুদ্দিনকে নয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছে। তিনি মজলিসে শূরার (সংসদ) সমর্থন পাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ফলে তার দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। যদিও কোয়ালিশন সরকারের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে শেষ রক্ষা হবে কি না বলা মুশকিল। শাহাবুদ্দিন  কিংবা অন্য যে কারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি সব প্রশ্নের জবাব দেয় না। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারণে গিলানি অভিযুক্ত হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে নয়া প্রধানমন্ত্রী আদৌ কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না? পাকিস্তানের বর্তমান যে সঙ্কট, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন জারদারি অবৈধভাবে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন এবং ওই টাকা সুইজারল্যান্ডে পাচার করেছিলেন। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে সুইজারল্যান্ডে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু (২০০৭) জারদারিকে ক্ষমতার পাদপ্রদীপে নিয়ে আসে। তিনি ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুইজারল্যান্ডের ওই মামলার তদন্ত  কাজ স্থগিত করতে প্রভাব খাটান। কিন্তু পাকিস্তানের উচ্চ আদালত আবার মামলা শুরু করার ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডকে অনুরোধ করতে গিলানির প্রতি নির্দেশ দেন। গিলানি উচ্চ আদালতের এই নির্দেশ অমান্য করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট দায়মুক্তি পেয়েছেন। তাই তার পক্ষে সুইজারল্যান্ড কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখা সম্ভব নয়। এই যুক্তি উচ্চ আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এখন নয়া প্রধানমন্ত্রী মখদুম শাহাবুদ্দিন কী করবেন? তিনি কি চিঠি লিখবেন সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে, নাকি গিলানির পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন? নয়া প্রধানমন্ত্রী যদি গিলানিকে অনুসরণ করেন তা হলে তিনিও যে আদালত অবমাননার শিকার হবেন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় প্রশ্ন, জারদারির ভূমিকা এখন কী হবে? তিনি কি রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে পারবেন? গিলানি অযোগ্য হলেন বটে, কিন্তু এর জন্য তিনি এতটুকুও দায়ী নন। ইফতেখার-জারদারির দ্বন্দ্বে বলি হলেন গিলানি। জারদারির একটা বড় ব্যর্থতা তিনি এই সঙ্কেটে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা নওয়াজ শরিফের সমর্থন পাননি। মূলত আদালত অবমাননার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন নওয়াজ শরিফ স্বয়ং। তৃতীয় প্রশ্ন, বিচার বিভাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে লাভবান হবে কোন শক্তি? অত্যধিক ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী তথা সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানির ভূমিকাও বা কী এই সঙ্কটে? কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই সঙ্কট থেকে কোনো সুবিধা নেবে কি না? চতুর্থ প্রশ্ন, সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসতে পাকিস্তান কি সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? আগামি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পাকিস্তানের ইতিহাস বলে, অতীতে কখনই কোনো সরকার তার টার্ম (পাঁচ বছর) শেষ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে পিপিপির নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এই টার্ম শেষ করে, তা হলে এটা হবে একটা রেকর্ড। পঞ্চম প্রশ্ন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের উত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে উচ্চ আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে আগামীতে ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তির পথ কি উন্মুক্ত হল? ইমরান খান রাজনীতিতে এসেছেন কিছুদিন হল। তিনি একটি দলও করেছেন-‘তেহরিক-ই ইনসাফ’। তার মূল স্লোগান হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত পাকিস্তান। উচ্চ আদালত গিলানির বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন, তার পেছনেও কাজ করছে এই দুর্নীতির প্রশ্নটি। একসময় জারদারি পরিচিত ছিল ‘মি. টেন পারসেন্ট’ হিসেবে। স্ত্রী বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন বড় বড় কনট্যাক্ট তিনি পাইয়ে দিতেন অর্থের বিনিময়ে। ওই টাকায় তিনি দুবাইয়ে  বিশাল বাড়ি কিনেছেন। সুইজারল্যান্ড তথা লন্ডনেও রয়েছে তার সম্পদ। তবে তার প্রতিপক্ষ নওয়াজ শরিফও ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নন। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আগামীতে উচ্চ আদালত যদি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধেও কোনো রুল ইস্যু করে আমি অবাক হব না। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ইমরান খান সামনে চলে আসছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইমরান খানের মাঝে বিকল্প শক্তি দেখতে চাইবে। পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সঙ্গেও ইমরান খানের যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইসরায়েল অনেকদিন ধরেই চাইছে পাকিস্তান তাদের স্বীকৃতি দিক। এখন ইমরান খানকে যদি ক্ষমতায় আনা যায়, তা হলে ইসরায়েলের স্ট্র্যাটেজি তাতে সার্থক হবে। উচ্চ আদালতের রায় ইমরান খানের ইসলামাবাদে যাওয়ার যাত্রাপথকে আরও প্রশস্ত করছে কি না, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। ষষ্ঠ প্রশ্ন, এই রায় ইসলামী কট্টরপন্থীদের স্ট্র্যাটেজিতে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন ডেকে আনবে? আমার তা মনে হয় না। পাকিস্তান বাহ্যত ধীরে ধীরে আরেকটি ‘তালেবানি রাষ্ট্র’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী পাখতুন খোয়া প্রদেশে সনাতন রাজনীতির কোনো প্রভাব নেই। এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তানপন্থী তালেবানরা। উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানসহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব সীমান্ত প্রদেশ এখন ইসলামিক কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে। এদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানদের রয়েছে যোগাযোগ। পাকিস্তান অধ্যুষিত এই অঞ্চলে একটি ইসলামপন্থী দল স্থানীয় ক্ষমতা পরিচালনা করে বটে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে কট্টরপন্থীরা। তাই এখানে দীর্ঘদিন যাবত্ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানববিহীন ড্রোন বিমান হামলা পরিচালনা করে আসছে। কট্টরপন্থীদের প্রভাব দিন দিন বাড়ছেই। পাঁচ-ছয় বছর আগে পাকিস্তান সফরে গিয়ে কট্টরপন্থীদের যে ‘শক্তি’ আমি দেখেছিলাম, আজ সেই ‘শক্তি’ কমেনি, বরং বেড়েছে। ইসলামাবাদে গিলানি সরকারের পতন ঘটলেও পাকিস্তানি তালেবানদের তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়ছেই।
পাকিস্তানে একটি পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। মনে রাখতে হবে, আগামী ২০১৩-১৪ সাল পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এর ফলে কারজাই সরকার আদৌ কাবুলে থাকতে পারবে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। মডারেট তালেবানদের সঙ্গে (যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে) কারজাই সরকারের যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে এ অঞ্চলে তার স্বার্থ পরিত্যাগ করবে, আমার তা মনে হয় না। ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে এক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে। চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’র এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। ভারত হচ্ছে তার সঙ্গী। এ ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পাকিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রথমত, আফগানিস্তানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের পথ পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে। পাকিস্তান এই পথ (খাইবার উপতক্যা) বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য বেলুচিস্তানের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অতি জরুরি। পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তান থেকে ইরান সীমান্ত মাত্র ৭২ কিমি দূরে। তৃতীয়ত, গাওদারের গভীর সমুদ্রে রয়েছে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি। ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে বেলুচিস্তানের গাওদার ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে তাই দরকার ইসলামাবাদে একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার। গিলানি সরকার মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারছিল না। তাই তাকে চলে যেতে হল। আগামীতে যিনিই আসবেন তাকে মার্কিনি স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তবে মার্কিন আইনপ্রণেতারা পাকিস্তান সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ‘ব্লাক হোল’-এর মতো-কোন দিকে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। আর এর শেষ কোথায়, তাও কেউ বলতে পারছে না। 
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahman bd.blogspot.com

রোহিঙ্গা মুসলমান : ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি


॥ ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ॥


বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। মূলত এরাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী মূল ধারার সুন্নি আরব মুসলমান। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারকবাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। এমনকি আরাকানের সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আরাকান অঞ্চল থেকে মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলার সব আয়োজন শেষ করেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তা ছাড়া আরাকানের মগ সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের আরাকানি জাতিগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেও নারাজ। ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে নিজ দেশে নাগরিকত্বহীন অবস্থায় পরবাসী হয়ে জীবনযাপন করছে। অথচ তাদের কেউ হাজার বছর, কেউ পাঁচ শতাধিক বছর আর কেউ বা কয়েক শ’ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। 
অতি সম্প্রতি জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের নামে আবারো সেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় মগ জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য সহায়তায় আরাকানের মংডু এবং আকিয়াব এলাকায় চলছে নির্বিচারে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বিরানভূমিতে পরিণত করছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা তরুণী নারীদের অপহরণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক তরুণী নারীকে অপহরণ করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। খাল, বিল ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মহিলাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে। মানবিক বিপর্যয়ের এক জ্বলন্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতভিটে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটেখাওয়া অশিতি, অর্ধশিতিসহ সমগ্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। সর্বস্ব হারিয়ে নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিতে সম কি না কিংবা আশ্রয় দিলেই এ সমস্যার সমাধান হবে কি না এসব বিতর্কের কারণে বাংলাদেশ সরকারও ভীষণভাবে কঠোরতা অবলস্বন করে তাদের আশ্রয়ের কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। এমনকি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃঢ়চেতা ভাষণ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো বেশি আতঙ্কিত করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। ফলে আহত ও নির্যাতিত অসহায় মানুষগুলোকে অবর্ণনীয় কষ্টের মাধ্যমে নদী আর সাগরজলেই মৃত্যুমুখে গমন করতে হচ্ছে। বিশ্বায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও মানবিক উৎকর্ষের এ উন্নত যুগে সবার চোখের সামনে এমন মানবিক বপর্যয় ঘটে যাচ্ছে নির্বিঘœভাবে। কেউ যেন নেই দেখার, সাহায্যের হাত বাড়ানোর কিংবা ন্যূনতম সহানুভূতি প্রকাশ করার। চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত আরাকান রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। 
রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রোপট
আরাকান এককালে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অধুনা মিয়ানমারের একটি প্রদেশ। অনুরূপভাবে রোহিঙ্গারাও এক সময় স্বাধীন আরাকানের অমাত্যসভা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখলেও বর্তমানে তারা আরাকানের সবচেয়ে নিগৃহীত জাতিগোষ্ঠী। ১৭৮৪ সালে বর্মিরাজ বোধপায়ার আরাকান দখলের মধ্য দিয়েই মূলত রোহিঙ্গাদের নিগৃহীত জীবনের সূচনা হয়। অতঃপর ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তিলগ্নে ব্রিটিশ কূটকৌশলের ফলে তাদের জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো অনিশ্চয়তা নেমে আসে। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মায় ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা নে উইন কর্তৃক মতা দখলের পর থেকে রোহিঙ্গারা ক্রমশ নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে থাকে। অবশেষে ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের নামে তাদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে কল্লা বা বিদেশী আখ্যা দিয়ে দেশ থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে আরাকানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জীবনে এ দুর্ভোগের পেছনে নিম্নোক্ত কারণ উল্লেখ করা যায়Ñ 
প্রথমত, রোহিঙ্গারা দীর্ঘ হাজার বছরের পথপরিক্রমায় আরাকানের অমাত্যসভাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন থাকলেও তারা নেতৃত্বের েেত্র স্বতন্ত্র কোনো ধারা সৃষ্টি করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে বর্মিরাজ বোধপায়া কর্তৃক ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান দখলের পর আরাকানের সর্বময় মতা বর্মিদের হাতে চলে যায়। এরা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাসহ আরাকানি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করে। অবশিষ্টদের অনেকেই প্রাণভয়ে বাংলায় পালিয়ে আসে এবং ১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধের মাধ্যমে আরাকান দখল পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে দেশের বাইরে অবস্থান করে। এ সময়ে সিন পিয়ানসহ অনেক আরাকানি নেতা স্বদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করলেও বিভিন্ন কারণে তারা ব্যর্থ হয়। ফলে বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা নেতৃত্বের দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ১৮২৬ সালে আরাকানে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তারা রোহিঙ্গাদের বাহ্যিক কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের মতার ভিত্তি মজবুত করে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনেই আরাকানের প্রশাসনের বিভিন্ন ত্রে ছাড়াও কৃষি, ব্যবসায় প্রভৃতি কাজের জন্য বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানিদের স্বদেশে বসবাসের সুযোগ দেয়। এ সময় রোহিঙ্গাদের নেতৃস্থানীয় শিতি শ্রেণীর অনেকেই আরাকানে ফিরে না গিয়ে বাংলার কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীসহ কিছু নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে গেলেও নেতৃত্বের েেত্র নতুন করে কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে সম হয়নি। পান্তরে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানেরা ব্রিটিশের কর্তৃত্বকে সহজে মেনে না নেয়ার কারণে বরাবরই তারা মুসলমানদের শক্র মনে করত। ফলে বার্মায় পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রোহিঙ্গারা যাতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে, সে জন্য তাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত না করে স্থানীয় মগদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এমনকি ব্রিটিশ কর্তৃপ বার্মাকে স্বাধীনতা দেয়ার আগে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মগদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা-উত্তর মিয়ানমারের মতাসীন বর্মি ও স্থানীয় মগরা সে ইস্যুকে ক্রমেই শক্তিশালী করে তোলে; যার সর্বশেষ পরিণতি হিসেবে রোহিঙ্গারা কল্লা বা ভিনদেশী চিহ্নিত হয়ে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়। ব্রিটিশশাসিত বার্মাকে মুক্ত করার আন্দোলনে রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানকে সমর্থন দিয়ে বার্মাকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করলেও তারা তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মার শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অজুহাতে তাদের মিয়ানমার বা আরাকানের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করে শুধু আরাকানের বাসিন্দা হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।
রোহিঙ্গারা আরাকানের স্বাধিকার আন্দোলন শুরু করলে রাজনৈতিক কৌশলে তাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। অতঃপর তাদের ওপর চালানো হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। এ প্রোপটে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ ও বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় বিষয়টির বাহ্যিক সমাধান নিশ্চিত হয়। তাই রোহিঙ্গাদের নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করে ১৯৮২ সালে বিতর্কিত বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন ঘোষণা করেন। এ আইনে নাগরিকদের Citizen, Associate Ges Naturalized শ্রেণীতে ভাগ করে ১৮২৩ সালের পরে আগত বলে Associate কিংবা ১৯৮২ সালে নতুনভাবে দরখাস্ত করে Naturalized Citizen ঘোষণা করার ব্যবস্থা করে। ওই আইনের ৪ নম্বর প্রভিশনে আরো শর্ত দেয়া হয়, কোনো জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কি না তা নির্ধারণ করবে আইন-আদালত নয়; সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা Council of State, এ আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রোহিঙ্গাদের কাছে কালো আইন হিসেবে বিবেচিত এ আইন তাদের সহায়-সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রতিরা সার্ভিসে যোগদান, নির্বাচনে অংশ নেয়া কিংবা সভা-সমিতির অধিকারসহ সার্বিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাসহ প্রচারমাধ্যমগুলো তাদের সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হিসেবে সম্বোধন করে।
১৯৭৮ এবং ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন অপারেশনের নামে আরাকানে এক অমানবিক নির্যাতন চালায়। এ অপারেশনে তারা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং দুই পর্বে প্রায় পাঁচ লাধিক রোহিঙ্গাকে তাদের পৈতৃক বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রতিবেশী বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ত্রাণকার্যক্রমসহ আশ্রয়ণ ক্যাম্প তৈরি করে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতায় বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তথাপিও রোগ-শোক, অনাহার-অর্ধাহারে নাফ নদী পেরিয়ে আসা অসংখ্য লোক প্রাণ হারায়; যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও কৌশল অবলম্বন করে দ্বিপীয় ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান করেন। 
জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে কাজ করলেও রোহিঙ্গাদের েেত্র শুধু শরণার্থীদের অস্থায়ী পুনর্বাসন, ভরণপোষণ তথা শরণার্থী জীবনযাপনে সার্বিক সহযোগিতা করছে কিন্তু নাগরিক অধিকার দেয়ার েেত্র তেমন কোনো ভূমিকা পালন করছে না। তা ছাড়া মিয়ানমারের মিলিটারি শাসকেরা বিশ্ব মতামতের খুব একটা ধার ধারে বলে মনে হয় না। সে দেশের বিরোধী নেত্রী, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অংসান সুচি দীর্ঘদিন যাবৎ বন্দী অবস্থায় জীবনযাপন করেছেন। 
যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য তিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আরাকানি মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের সহস্র বছরের বন্ধন ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে; মানবতার জন্য বাংলাদেশের এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে; এ েেত্র বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করে ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো মিলে জাতিসঙ্ঘের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যদি মানবাধিকারের মমত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে এসে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করার দৃঢ় পদপে গ্রহণ করে তবেই কিছুটা আশার আলো দেখা যাবে। সেই সাথে বাংলাদেশকেও মিয়ানমার সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আরো আন্তরিক হওয়া উচিত। 
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
mrakhanda@gmail.com