রবিবার, ২৭ মে, ২০১২

ওবামার গলার কাঁটা আফগানিস্তান


॥ মহীউদ্দীন আহমদ ॥


আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দ্রুততম সময়ে এরা আফগানিস্তান ছাড়তে বদ্ধপরিকর। তাদের তাড়াহুড়ো দেখে মনে হচ্ছে, আফগানিস্তান ছাড়তে পারলেই এরা বেঁচে যায়। যেকোনো মূল্যে আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসতে হবেÑ এটাই ওবামা প্রশাসনের শেষ কথা। এ দিকে ন্যাটো সম্মেলনে আফগানিস্তানের সামনে কঠিন সময় পড়ে আছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এই সতর্কবাণী এমন একসময়ে উচ্চারণ করা হলো, যখন ন্যাটো জোট তড়িঘড়ি করে পাততাড়ি গুটাতে ব্যস্ত। বাস্তবে আফগান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, দখলদার বাহিনীর পক্ষে আফগান রণাঙ্গন ছেড়ে যাবার কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। কাবুলে আকস্মিক সফরে গত ২ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাগরাম সেনা ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের অভয় দিয়ে বলেছেন, আফগান যুদ্ধের সময় শেষ হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র আলকায়েদা নেটওয়ার্ককে পরাজিত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, আমরা নতুন দিনের ভোরের আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি। তালেবানদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে ওবামা বলেন, আমরা এটা স্পষ্ট করে বলছি, আলকায়েদার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে এবং আফগানিস্তানের আইন মানলে তালেবান ভবিষ্যতে দেশটির অংশ হতে পারে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের অস্ত্র সমর্পণ ও আত্মসমর্পণের শর্ত দিয়েছিল, এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আফগান সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যুদ্ধ ত্যাগ করার কথা বলছে। তালেবানরা অবশ্য বলেছে, তারা শান্তিপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেও ন্যাটো বাহিনীর ওপর হামলা ত্যাগ করবে না। কাবুলের কূটনৈতিক পাড়ায় সর্বশেষ ব্যাপক হামলার মাধ্যমে তালেবানরা তাদের পূর্বঘোষিত কৌশল কার্যকর করারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তালেবানরা সামরিক হামলার মাধ্যমে মার্কিনিদের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করেছে। বিলম্বে হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপলব্ধি হয়েছে, তালেবানদের সাথে সমঝোতা ছাড়া আফগান সঙ্কট থেকে উত্তোরণের কোনো পথই উন্মুক্ত নয়। বস্তুতপক্ষে রণাঙ্গন ও রণাঙ্গনের বাইরে তালেবানদের শক্তিশালী অবস্থান ও তালেবানদের প্রতি আফগান জনসমর্থন যুক্তরাষ্ট্রকে তালেবানদের মূল্যায়নে বাধ্য করেছে। আলোচনার টেবিলে বসাতে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের প্রায় সব শর্তই পূরণ করেছে, তাদের নেতাদের মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কিছু মুক্তি পেয়েছে, কাতারে রাজনৈতিক দফতর খোলা হয়েছে, তালেবানদের শক্তিমত্তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। এত দিন যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছিল, তালেবানদের শক্তি ও সামর্থ্য শেষ হয়েছে। তারা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। আবার তারাই গোপন প্রতিবেদনে বলেছে, তালেবানদের শক্তি-সামর্থ্য অর্থপ্রাপ্তির উৎস কোনোটাই নিঃশেষ হয়নি, অুণœ রয়েছে। কাবুলের নিরাপত্তা বলয়ে সর্বশেষ ব্যাপক সামরিক হামলায় তাই প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, কাতারভিত্তিক আলোচনার প্রক্রিয়ায় তালেবানরা সংযুক্ত হয়েছে। এ দিকে পাকিস্তানকেও আলোচনাপ্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে কাতারের আমিরের সাথে আলোচনা করেছেন। আমিরে কাতার আলোচনায় পাকিস্তানের স্বার্থ কোনোভাবে ুণœ হতে দেয়া হবে না বলে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করেছেন। এর আগে পাকিস্তান তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনায় সমর্থন দিয়েছিল। পাকিস্তান বলেছে, আফগানিস্তান নিয়ে ইসলামাবাদের কোনো গোপন অভিলাষ নেই এবং আফগানরা নিজেদের জন্য যে পথ বেছে নেবে তাতেই সমর্থন দেবে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে, শান্তিপ্রক্রিয়াটি অবশ্যই হতে হবে আফগানদের নেতৃত্বে, যুক্তরাষ্ট্র বা বাইরের কোনো শক্তির নেতৃত্বে নয়। তবে প্রক্রিয়া যা-ই হোক না কেন, বাস্তবতা হলোÑ পাকিস্তান-আফগানিস্তান ও তালেবানদের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতাই কেবল আফগানিস্তানে শান্তি অর্জনে ফলপ্রসূ হতে পারে। কোনো এক পক্ষকে আলোচনার বাইরে রেখে শান্তিপ্রক্রিয়ায় সফলতা আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র মাঝে মধ্যেই আফগানিস্তানে তাদের ব্যর্থতার দায়ভার পাকিস্তানের ওপর চাপাতে চায়। তালেবান ও আলকায়েদা গেরিলাদের দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এরা ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের ওপর চাপিয়েছে। পাকিস্তান বলেছে, উপজাতি-অধ্যুষিত সাতটি অঞ্চলের মধ্যে ছয়টি অঞ্চল তারা ইতোমধ্যেই তালেবানমুক্ত করেছে। সুতরাং তাদের সফলতা অনেক বেশি। 
পশ্চিমারা তালেবানদের যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখুক না কেন, বাস্তবতা হলোÑ আফগান জনগণ কারজাই, আফগান সেনাবাহিনী ও ন্যাটো জোটের ওপর মোটেও আস্থাশীল নয়। সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো তালেবান নেতাদের ওপর রয়েছে। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারজাই সরকারের আইনকানুন বলতে সবই কাগুজে, তালেবান নেতৃত্বই সেখানে প্রতিষ্ঠিত। দেশের এক উপজাতীয় নেতার মতে, বিদেশী সেনারা যেভাবে চক্কর দিয়ে চলে যায়, এতে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কাজেই অন্যায়-অবিচার হলে এর বিচারের জন্য স্থানীয় তালেবান নেতাদের দ্বারস্থ হন তারা। এভাবে ক্ষমতা আপনা-আপনি তালেবানদের হাতে চলে যায়। তার ভাষ্য মতে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকার স্থানীয় প্রশাসন তালেবানদের হাতে। কারজাই সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি তালেবানদের সমর্থন ভারী করতে সহায়তা করেছে। তাদের মতে, দুর্নীতি বিচার বিভাগের শিকড়ে জেঁকে বসেছে। কাজেই সুবিচারের জন্য তারা তালেবান বিচারকদের কাছে গিয়ে ধরনা দিচ্ছে। তালেবানি আদালতের তুলনা করতে গিয়ে জামশিদ (৩০) নামক কাবুলের এক ফল বিক্রেতার বক্তব্য হলোÑ তালেবানদের আদালত সংক্ষিপ্ত সময়ে দ্রুত কাজ করে। সেখানে বিচার হয় কঠোর নিয়ম মেনে। জামশিদ বলেন, কেউ চুরি করলে দ্রুত বিচার শেষ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আর কারজাই প্রশাসনের অধীনে সে চোরের অপরাধ প্রমাণ করতেই শতবর্ষ লেগে যাবে, বিচার শেষে চোরের শাস্তি হবে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তালেবান নেতা বা যোদ্ধার নামে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে, দোষী সাব্যস্ত হলে ওই নেতা বা যোদ্ধাকে শাস্তি দেয়া হয়Ñ এটি তাদের জনগণের মন জয়ের বড় একটি কারণ। সাধারণ মানুষের তালেবান যোদ্ধাদের ওপর এই আস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হতাশ করেছে।
কাতারভিত্তিক শান্তি আলোচনার কোনো ফলাফল বা অগ্রগতি এখনো সামনে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও কারজাই প্রশাসন জোর তৎপরতা চালালেও আশাব্যঞ্জক কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তালেবানরা এ ব্যাপারে বেশ কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কাবুলে ন্যাটোর বেসামরিক কর্মকর্তা সাইমন গাম বলেন, সত্যি বলতে কিÑ তালেবান কখনো আলোচনার টেবিলে আসবে কি না আমরা তা জানি না। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিদেশী সেনারা চলে গেলে তালেবানদের সাথে আলোচনা সহজ হবে। কারণ তারা বলে আসছে, বিদেশী সেনাদের তাড়াতেই তারা লড়ছে। তালেবানদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ হলো, তালেবানরা কাবুল ও আশপাশের পরিস্থিতিকে তাদের অনুকূলে বিবেচনা করছে।

দুই.
এ দিকে এপ্রিল মাসের শেষার্ধে আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারী ও কৌশলগত সহায়তা চুক্তির প্রাথমিক খসড়ায় স্বাক্ষর করেছেন। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো জোটের সৈন্য প্রত্যাহারের পর কাবুল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কের কাঠামো কেমন হবে তা নির্ধারণই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র গেভিন সান্ডওয়াল চুক্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য আফগানিস্তানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব, যা আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি জোরদার করবে এবং আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন অর্থাৎ আলকায়েদা ও তাদের চরমপন্থী সহযোগীদের পরাজিত করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। আমরা মনে করি, কৌশলগত চুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার মার্কিন কৌশলের মূলে থাকছে সদ্য সমাপ্ত নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহায়ক চুক্তি। আফগানিস্তান থেকে বহুজাতিক সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের থেকে যাওয়া ও তাদের নিরাপত্তা প্রদান আফগান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদান এবং আর্থিক সহায়তাদানের বিষয় চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আফগানিস্তানের গত কয়েক মাসের ভয়াবহ অস্থিরতার পর এই চুক্তিকে কোনো কোনো মহল উভয় দেশের বড় অর্জন ও স্বস্তির কারণ হিসেবে দেখলেও বাস্তবে কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে নিরাপদ অবস্থানের পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে নিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের অবস্থান রণাঙ্গনে নয়, অন্দর মহলে থাকবে। কারজাই দলিল করে আফগানিস্তানের মাটিতে বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতি মেনে নিয়েছেন। ফলে হুমকিতে পড়বে আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। বিদেশী সৈন্য কারজাইকে পাহারা দিতে নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সংরক্ষণ করতে আফগানিস্তানে অবস্থান করবে। আর আফগান মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যের উপস্থিতি আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে কতটুকু সহায়ক হবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দিবে। তালেবানরা নীতিগতভাবে তাদের জমিনে বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতি মেনে নিতে রাজি নয়।
আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে গণচীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উৎকণ্ঠার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এশিয়ার এই অঞ্চলে চীনের সরব উপস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই মনে করে। এমন বাস্তবতায় এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার উচ্চাভিলাষী সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা চরিতার্থে এক নতুন কৌশল প্রণয়নে ব্যস্ত। কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মালদ্বীপসহ এশিয়ার সমুদ্রবেষ্টিত বিশাল অঞ্চলকে ঘিরে নতুন প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে যাচ্ছে। আসন্ন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এবং এশিয়ায় অধিকতর মনোযোগী হওয়ার লক্ষ্যে ওবামার প্রয়োজন দ্রুততম সময়ে আফগান সঙ্কটের একটা সমাধান নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান নিয়ে যে সঙ্কটে ভুগছে, তা থেকে উত্তোরণে তালেবানদের সাথে সমঝোতার পথ বেছে নিতে হয়েছে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী তালেবান নেতাদের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়ে ইসলামাবাদ, কাবুল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে গত মাসে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছেÑ তালেবানরা বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না, যতটা গুরুত্ব রয়েছে কাবুল ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাছে। তালেবানরা আলোচনায় কালক্ষেপণের নীতি অবলম্বন করেছে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান বিবেচনায় হয়তো তাদের এই কৌশল। 
যুক্তরাষ্ট্র-আফগান কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়টি তালেবানদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ যুক্তরাষ্ট্রের জিওলোজিক্যাল সার্ভে অনুযায়ী আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের অতীব মূল্যবান খনিজ ও ধাতবসহ প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। তেল, ইউরোনিয়াম, স্বর্ণ, তামার এসব খনির ওপর লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর। সে জন্য যেটা প্রয়োজন তা হলোÑ আফগানিস্তানে এমন একটি সরকার দরকার, যে নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখানে কাজের সুযোগ করে দেবে। সুতরাং আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থ অনেক গভীরে। এখানে ভূ-কৌশলগত রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত রয়েছে। এতে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। আফগানিস্তানে শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের যে প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র চালাচ্ছে এবং এর পেছনে যে অর্থ ব্যয় করছে, তা শুধু আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বিবেচনায় করা হচ্ছে না, এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থও জড়িত। 

ইউরোপীয় গণতন্ত্রের সংকট


অমর্ত্য সেন
অনেক সময় উদ্দেশ্য ভালো হলেও যে রসাতলে যাওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হয় তার প্রমাণ ইউরোপের গৃহীত নীতি। এর কারণেই ইউরোপে আজ অর্থনৈতিক সংকট। এটা বিশ্বে দুর্দশা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
এর কারণও রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে অধিকতর ভালো অর্থনৈতিক জবাবদিহিতা ও অধিকতর দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন থেকেই দরকার ছিল। তবে সময় নির্বাচনটা গুরুত্বপূর্ণ; চরম ব্যস্তগতিতে করা সংস্কার আর সুচিন্তিত সময়সীমায় সংস্কারের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হয়। গ্রিস জবাবদিহিতায় সমস্যা থাকার পরও ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার আগে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েনি। বস্তুত গ্রিসের অর্থনীতি ২০০৬ সালে ৪.৬ মাত্রায় প্রবৃদ্ধি হচ্ছিল এবং ২০০৭ সালে এর প্রবৃদ্ধি হয় ৩ শতাংশ। এরপরই শুরু হয় অব্যাহতভাবে গ্রিস অর্থনীতি পতনের ধারায় নিমজ্জিত হওয়া।
সংস্কারটা যতই জরুরি বলে বিবেচিত হোক না কেন, এটার একতরফা প্রয়োগ এবং আকস্মিক ও নির্মমভাবে সরকারি সেবা কর্তন সুফল দেয়নি। এভাবে বাছবিচারহীনভাবে সেবা কর্তনের ফলে বাজারে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। আসলে এটা একটা কুফল দায়ী কৌশল। এর ফলে বিপুল বেকারত্ব দেখা দেয় এবং শ্রমনির্ভর নয় এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার চাহিদার অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। উৎপাদনশীলতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়া দেশ গ্রিসের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ইউরোপের আর্থিক নীতির (মুদ্রার অবমূল্যায়ন) আওতায় আর্থিক প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়। অথচ ইউরোপীয় নেতারা যে রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন দেখতে চান তা মারাত্মকভাবে প্রবৃদ্ধিবিরোধী। গত বছর চতুর্থ কোয়ার্টারে ইউরো জোনের অর্থনৈতিক উৎপাদন শক্তি হ্রাস অব্যাহত থাকে। পরিস্থিতি এমনি দাঁড়ায় যে, সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে ইউরো জোনের প্রবৃদ্ধি শূন্য প্রাক্কলন করার পর সেটাই ভালো সংবাদ হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।
বস্তুত ঘাটতি হ্রাস করার কার্যকর পন্থা হলো এর সঙ্গে দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে যুক্ত করা এবং এর পক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণও রয়েছে। দ্রুত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অধিকতর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিপুল ঘাটতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে অপসৃত হয় এবং এ ধরনের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রে বিল ক্লিনটনের শাসনামলে। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে সুইডেনের প্রশংসিত বাজেট ঘাটতি হ্রাসও মূলত দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণেই সম্ভব হয়। এর বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলো আজ যখন শূন্য বা নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকা রয়েছে, তখন তাদের ঘাটতি হ্রাসের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এখানে নিশ্চিতভাবেই আমরা কেইনসের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। তিনি রাষ্ট্র ও বাজারের পরস্পর নির্ভরশীলতাকে ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে রাজনৈতিক অঙ্গীকারসমেত যে সামাজিক ন্যায়বিচারের আবশ্যকতা দেখা দেয়, সেটা সম্পর্কে কেইনসের তখন বলার মতো অবস্থা দেখা দেয়নি। এটাই ইউরোপে আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্ম দেয়। এটা বাজার অর্থনীতিকে সমর্থন জোগানোর জন্য নয়, মানবজাতির কল্যাণের জন্য উদ্দেশ্যতাড়িত।
যদিও সেই আমলে সামাজিক ইস্যুর ব্যাপারে কেইনস ততটা গভীরভাবে জড়িত হননি, তথাপি অর্থনীতির একটা অতি পুরনো ঐতিহ্য হলো দক্ষ বাজারের নিশ্চয়তার সঙ্গে সঙ্গে বাজার ব্যবস্থা সাধারণের যেসব সেবা নিশ্চিত করতে পারে না সেসবের ব্যাপারে বিধিবিধান রাখা। অ্যাডাম স্মিথ (সাধারণত মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রথম গুরু বলা হয়) 'দি ওয়েলথ অব নেশনস'-এ লেখেন, অর্থনীতির দুটি স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য থাকে। প্রথমত, প্রচুর আয় বা জনগণের জীবন নির্বাহের জন্য অথবা আরও যথাযথভাবে বলতে গেলে এ ধরনের আয় যেন তাদের জীবনোপায়ের কাজে লাগে, তার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র বা কমনওয়েলথকে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত আয়ের ব্যবস্থা করা।
ইউরোপের বর্তমান দুর্দশার কারণ হলো, এখানে গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের জায়গায় অর্থনৈতিক নির্দেশনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ অংশীদারিত্বমূলক সাধারণের আলোচনার মাধ্যমে ইউরোপের সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তির প্রতি হুমকি সৃষ্টি না করে সরকার একটি গ্রহণযোগ্য সময়ের মধ্যে যথাযথ সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারতেন। গণতান্ত্রিক তাত্তি্বক জন স্টুয়ার্ট মিল ও ওয়াল্টার বাগট এই তত্ত্বই ব্যাখ্যা করেছেন। অথচ এর বিপরীতটাই দেখা গেল। তেমন সাধারণ আলোচনা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণের সম্মতি ছাড়াই জনসেবা খাতে ব্যয় ব্যাপক কাটছাঁট করা হলো। এর ফলে ইউরোপের মানুষ ব্যাপকভাবে চরম বাম ও চরম দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে গেল।
এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইউরোপ একপক্ষীয় মতামতের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারে না অথবা জনগণের মতামত ছাড়া শুধু বিশেষজ্ঞদের ভালো উদ্দেশ্যতাড়িত মতামতের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ইউরোপে একটার পর একটা নির্বাচনে এ কারণেই জন-অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে। গণতন্ত্র ও ভালো নীতি তৈরি করার সুযোগ_ উভয়ই ইউরোপীয় নেতাদের নির্দেশিত অকার্যকর ও নির্জলা অন্যায্য নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অমর্ত্য সেন :নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং হার্ভার্ডের অর্থনীতি ও দর্শনের অধ্যাপক নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর সুভাষ সাহা

শনিবার, ২৬ মে, ২০১২

ভারত:গণতন্ত্রের ঘাড়ে দুর্নীতির ভূত

কুলদীপ নায়ার | তারিখ: ২৭-০৫-২০১২
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় দুর্নীতি এতই গতানুগতিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এগুলো আর খবরও হয় না। মানুষও দুর্নীতির সঙ্গে বসবাসকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে। তার মানে এই না যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ নেই। কিন্তু শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এর সঙ্গে জড়িত হতে দেখে তারা বুঝে নেয়, হয়তো এর কোনো প্রতিকার নেই।
সরকারের বাসনপত্রের আলমিরা থেকে একের পর এক দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির হাঁড়ি ধপাস ধপাস করে পড়ায় ভারত অস্থির হয়ে উঠেছে। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অপেক্ষাকৃত মুক্ত গণমাধ্যম একসময় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আস্থার সঞ্চার করেছিল। আর এখন নিজস্বতা না হারিয়েই সেসব রাষ্ট্রও ভারতের দুর্নীতির রথে উঠে পড়তে সক্ষম হবে। আবার ভারতে দুর্নীতিবিরোধী বড় পদক্ষেপ তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে প্রেরণা দেবে। 
বহু ঢাকঢোল পেটানো লোকপাল বিল আবারও মুলতবি হওয়ায় ভারতীয়দের মতো তারাও বড় রকমের নাড়া খেল। গত ৪২ বছর যাবৎ এই বিলের কপালে এটাই ঘটছে। এ সময়ের সরকারগুলো, যাদের বেশির ভাগই ছিল কংগ্রেসের, একের পর এক অজুহাত দিয়ে শাসক ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের বিচারের মুখোমুখি করার আইন ঠেকিয়ে রাখছে। এমনকি লোকসভা থেকে এটা পাস হয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনায় উঠলেও, মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়ার অজুহাতে গত নভেম্বরে সরকার বৈঠকটি স্থগিত করে দেয়। এবারও সেই একই নাটক করা হয়েছে, তবে পাণ্ডুলিপিতে সামান্য কিছু বদল এসেছে। 
রাজ্যসভায় চোখের সামনে এই নাটকের একের পর এক দৃশ্য উন্মোচিত হতে দেখেছি। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে আমি সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। সেদিই চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য বিলটা পেশ করা হয়। একটা আপত্তির জায়গা হলো, রাজ্যগুলো কেন্দ্রের মাধ্যমে রাজ্যের লোকযুক্ত পদে নিয়োগ হোক তা চায় না। তারা মনে করে, নিজেদের এলাকার দুর্নীতি দূর করার কর্তৃপক্ষ তারা ছাড়া অন্য কারও হওয়া উচিত নয়। 
জেদাজেদির আরও কিছু বিন্দু রয়েছে। যেমন, এক. কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের নিয়ন্ত্রণ থাকা, এবং দুই. লোকপাল নিয়োগের জন্য একটি নির্বাচকমণ্ডলী গঠন (বর্তমানে এই মণ্ডলীতে সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ)। আশা করা হয়েছিল, ক্ষমতাসীন কংগ্রেস এই দুটি বিষয় নিয়েই গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নেবে। এমনকি তারা এ-ও বলেছিল যে সংসদের বাজেট অধিবেশন চলাকালেই ‘শক্তিশালী লোকপাল বিল’ সংসদে পাস হবে। সংসদ অধিবেশন শেষ হলো মঙ্গলবার, কিন্তু কোনো পদক্ষেপই দেখা গেল না। 
এই বিরক্তিকর নাটকের প্রথম দৃশ্য দেখা গেল তখন, যখন মুলায়াম সিং যাদবের দল সমাজবাদী পার্টি লোকপাল বিলকে পুনর্বিবেচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। এটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাত। কংগ্রেস যে বিলটা পাস করতে চায় না, দৃশ্যত প্রস্তাবটি ছিল তার নজির। অন্যদিকে জনগণ যেহেতু এই বিল পাস হওয়া না-হওয়া দিয়েই কংগ্রেসের দুর্নীতির বিরোধিতা পরীক্ষা করতে চায়, সেহেতু তারা দেখাতে চায় যে বিল পাসের ব্যাপারে তারা মরিয়া। 
রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা অরুণ জেটলি সেখানে উপস্থিত থাকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করেছেন, সরকার বিলটা কি চায় নাকি চায় না? ড. মনমোহন সিং নির্বিকারভাবে বসে ছিলেন। কিন্তু থলের বিড়াল বেরিয়ে গেল তখনই, যখন সরকার সিলেক্ট কমিটি নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা দেখাতে শুরু করল। এখান থেকেই দ্বিতীয় দৃশ্য তৈরি হলো, যেখানে সরকারের ষড়যন্ত্রী কাজকারবার ধরা পড়ল। সরকারের পদক্ষেপের বিষয়টি ভোটে দেওয়া হলে দেখা গেল, কোনো বিরোধিতা নেই। 
জেটলি সরকারের সোচ্চার প্রতিপক্ষ হলেও এ ব্যাপারে একদম সরকারপন্থী। একই ভূমিকায় নেমেছে বিজেপিও। বোঝা যায়, মুলায়াম সিং যাদব কংগ্রেসকে বাঁচিয়েছেন, কারণ তাঁর নিজের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতিবিরোধী মামলা ঝুলে আছে। সরকার যখনই দেখবে মুলায়াম সিং লাইনের বাইরে চলে যাচ্ছেন তখনই তারা মামলাগুলো সক্রিয় করে দেবে। সবচেয়ে বেশি হতহম্ভ হয়ে গেলাম বিজেপির ভোল পাল্টানো দেখে। কেন তারা কংগ্রেসের বিরোধিতা করল না তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমি কখনো দেখিনি যে প্রধান বিরোধী দল লোকপাল বিলের ভবিষ্যৎ জানতে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ লাগিয়ে থাকা লাখো কোটি মানুষের চোখের সামনে এভাবে ডিগবাজি খাচ্ছে! 
একটা ব্যাখ্যা আমাকে দেওয়া হয়েছে, যখন বিলটা ভোটে দেওয়া হলো সে সময় বিজেপির যথেষ্টসংখ্যক সদস্য পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলেন না। প্রশ্নটা এই না যে বিজেপি সরকারের চালকে নস্যাৎ করতে পারল কি পারল না। বিজেপি লোকপাল বিল সমর্থনে নিষ্ঠার পরিচয় দেয় কি না, সেটাই ছিল প্রশ্ন। সত্যিকার পরীক্ষার সময়ই বিজেপি গুটিয়ে গেল। এখন তারা যত হট্টগোলই করুক না কেন, তাদের মুখোশ খুলে পড়েছে। 
এখন জনগণেরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। বামপন্থী ছাড়া আর কেউ লোকপাল চায় না। তারা ভয়ে আছে যে তাহলে তাদের নেতারা ধরা পড়ে যাবে এবং শাস্তি পাবে। আন্না হাজারের আন্দোলন মনে হয় সরকারের অনুরোধে বন্ধ না হলেই ভালো হতো। সে সময় সমগ্র সংসদ সরকারকে বাধ্য করেছিল আন্না হাজারের কাছে এই বার্তা পাঠাতে যে সংসদ শক্তিশালী লোকপাল বিলের পক্ষে। 
কোনো সন্দেহ নেই আমার, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২৫ জুলাই থেকে আবারও আন্দোলন শুরু হলে জনপ্রিয়তা পাবে। যে জনঅসন্তোষ হাজারের মূল শক্তি, তা এখনো নিঃশেষিত হয়নি। আমার একমাত্র দুঃখ এই, হাজারের চারপাশে এত বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত লোকজন জড়ো হয়েছে যে একটি সৎ ও ধর্মনিরপেক্ষ জোট পুনর্গঠন করা কঠিন হবে। 
এই বেলায় কালোটাকা বিষয়ে সরকারি শ্বেতপত্র হয়তো কাজে আসবে। বিদেশে কী পরিমাণ কালোটাকা পাচার করা হয়েছে তার কোনো সরকারি হিসাব দেওয়া হয়নি। তার পরও সরকার অর্থ উদ্ধারের জন্য একবারের জন্য কর মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ফল না পাওয়া সত্ত্বেও অতীতেও এই চেষ্টা করা হয়েছে। সত্যি যে, আবাসন, সোনা ও পুঁজিবাজার সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের ওপর এসব খাতের হর্তাকর্তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। 
কয়েকটি রাজ্যে তো মন্ত্রীরা নিজেরাই জড়িত। রাজনৈতিক কারণে সরকারের পক্ষে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হলেও, লোকপাল সেটা পারতেন। এটাই হয়তো কারণ, যে জন্য সংসদের উচ্চকক্ষে লোকপাল বিল নিয়ে এত নাটক করা হলো। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, বিজেপি ও অন্যান্য দলগুলোর বোঝা উচিত যে তারা একসঙ্গে সব মানুষকে বোকা বানাতে পারবে না। 
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

স্নায়ুচাপে ইরান

স্নায়ুচাপে ইরান



॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥

পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে প্রায়ই ইরানে আসন্ন আক্রমণের সংবাদ বেরোয়। ওবামা প্রশাসনও ‘টেবিলে সব অপশন থাকার’ পুনরাবৃত্তি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এক যুগেরও বেশি ধরে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে পারস্য উপসাগরে ল্যান্ডিংড্রিলের প্রশিক্ষণ গ্রহণরত। সম্প্রতি পেন্টাগন ওই অঞ্চলে মার্কিনিদের রণপোতের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে। কিছু দিন হলো, ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধ ও গোয়েন্দা বিমানের ওড়াউড়িও শুরু হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক চালকবিহীন বিমান ভূপাতিতও করেছে।
ইসরাইলি গণমাধ্যমেও গুজবের অন্ত নেই। এমন একটি গুজব হলো, হরমুজ প্রণালীতে জেগে ওঠা ছোট দু’টি দ্বীপে মার্কিনিদের অবস্থান গ্রহণ সম্পর্কিত। তিন বছর আগে গাজা হত্যাকাণ্ডের হোতা বলে পরিচিত ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত ফেব্রুয়ারিতেই বলেছিলেন, ইরান আক্রমণের সুযোগ ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে, কেননা ইরানের অব্যাহত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেটি হতে দেবে না। ইসরাইলি উপপ্রধানমন্ত্রী মোসে ইয়ালন ঘোষণা দেন, তার দেশ যথেষ্টই আত্মবিশ্বাসী যে, তারা ইরানের বাছাই করা যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। তিনি আরো বলেন, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে তার লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। 
সদ্য বিদায়ী ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি বলেন, তার যুদ্ধে উসকানি অযৌক্তিক হবে যদি ইরান বোমা অর্জনে এবং পড়শিদের ভীতি প্রদর্শন করতে উন্মাদের মতো আর না ছোটে। সারকোজি হয়তো কখনো ভাবেননি, আধুনিক কালে ইরান কখনো কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেনি। পাশ্চাত্য ও আরব রাজতন্ত্ররাই সাদ্দাম হোসেনকে ইরান আক্রমণ করতে উৎসাহ দিয়েছিল। আট বছর দীর্ঘ সেই যুদ্ধে ১০ লাখ ইরানি আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
পাশ্চাত্যের এসব ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করেছে তেহরান। ইরানের ৩৩তম বিপ্লববার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র শিগগিরই পারমাণবিক ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের খবর দেবে। শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরান তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার কিছুতেই বর্জন না করার সঙ্কল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইরান একই নীতিতে অবিচল থেকে বারবার নিজেকে এনপিটিতে স্বাক্ষরকারী দেশরূপে স্বীকার করে আসছে এবং সেই অবস্থানে থেকেই তার একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পরিচালনার অধিকারের কথাই বলে আসছে।
ইরানের সব পারমাণবিক স্থাপনা এবং সেখানে কর্মরত সব কিছুই আইএইএর নজরে আছে। ইরান যে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ইউরেনিয়াম তৈরি করেনি তা নিশ্চিত করার জন্য ওই সংস্থাটিই যথেষ্ট। আয়াতুল্লাহ খামেনি পাশ্চাত্যকে কোনো সামরিক অ্যাডভেঞ্চারের বিরুদ্ধে কড়া সতর্ক করে দিয়েছেন এই বলে, যদি কোনো বিরুদ্ধাচরণের সূত্রপাত হয়, সেটি কিন্তু আমেরিকানদের জন্য অন্তত ১০ গুণ ভয়ঙ্কর হবে।
ইসরাইলের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে খামেনি বলেন, দেশটি প্রকৃতপক্ষে একটি ক্যান্সার বা টিউমার সমগ্র অঞ্চলের জন্য, যা কেটে ফেলা ছাড়া সমস্যার সুরাহা হবে না।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিও প্যানেটা গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রাসেলসে গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ বছরের মাঝামাঝি কোনো এক সময় ইসরাইল ইরান আক্রমণ করবে। গত ২০ ডিসেম্বর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্কিন ডেমসসে সিএনএনকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য সব রকম অপশনই পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। আমরা সেগুলো পরিমার্জন ও পরিশোধন করে দেখছি। ওই অপশনে পৌঁছলে কার্য সিদ্ধি হবে। ‘আমি সন্তুষ্ট আমাদের পরীক্ষণীয় অপশনগুলো এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে মনে হয় তা কাজ করবে।’ ইসরাইলের দক্ষিণপন্থী সরকার সর্বক্ষণ ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধানোর ফন্দিফিকিরে আছে। এই উগ্র সরকারটি ঠাণ্ডা মাথায় প্রায় স্থির করেই ফেলেছে এবং ধরেই নিয়েছে, বছর শেষে নির্বাচনে জড়িয়ে পড়ার আগে ওবামা প্রশাসনের সামনে ইসরাইলসহ ইরান যুদ্ধের পাট চুকিয়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
কিন্তু ওবামা প্রশাসনের বাস্তববাদীরা জানেন ইরানের বিষয়টি ইরাকের মতো নয়, বরং অনেক আলাদা। মার্কিনিরা ইরাককে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাবু করতে ও দখল করতে পেরেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের মেজাজকে একটু নমনীয় করতে বলেছিলেন, ইসরাইল তো এখন পর্যন্ত তাদের যুদ্ধের পরিকল্পনাই তৈরি করেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেনÑ আমেরিকা ও ইসরাইল যূথবদ্ধভাবেই ইরান সমস্যা সমাধানে কূটনীতির পথে এগিয়ে আসবে। ইত্যবসরে মার্কিন প্রেসিডেন্সির জন্য রিপাবলিকান প্রার্থীরা অবশ্য 'bomb, bomb Iran' -এর ধুয়া তুলেছেন।
এ দিকে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানিরা এত বেশি একতাবদ্ধ, যা আগে কখনো ছিল না। আরব রাজতন্ত্রগুলো পাশ্চাত্যের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক লড়াইকে নিঃসন্দেহে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারা জানে স্নায়ুর এই লড়াইয়ে ইরানেরও রয়েছে অনেক কার্ড। আরব দেশগুলোর শিয়া সম্প্রদায়ও ইতোমধ্যে তাদের একাধিক দাবিতে সোচ্চার। তারাও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইরানের ওপর কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তারা। 
ইরান একটি যুদ্ধসাপেক্ষে যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় এবং তেলের ট্যাংকারগুলো আটকা পড়ে, তাহলে তেলের মূল্য আকাশচুম্বী হবে; যা একটি নির্বাচনী বছরে আমেরিকানদের জন্য সুখকর হবে না। সাথে সাথে একটি সমান্তরাল পথে যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়াভাবে তার ট্রাডিশনাল মিত্র এবং বাণিজ্যিক সহযোগীদের বেকায়দায় ফেলেছে, যার আওতায় ইরান বা ভারতের মতো দেশও রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজের একপক্ষীয় অবরোধকে কার্যকর করতে তার সাথে কোনো প্রকার বিবাদবিহীন দেশেরও ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে।
আলোচনার জন্য সম্প্রতি যখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই ওয়াশিংটনে যান। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া ল্যান্ড রিপোর্টার্সদের বলেন, ভারত কী করে জ্বালানির একটি বিকল্প উৎস পেতে পারে, সেটিই আলোচ্য। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের Two Track Policy বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, যাতে ইরানি তেলে অভ্যস্তদের ওই অভ্যাস থেকে ছাড়িয়ে নেয়া এবং বিশ্বজুড়ে সাপ্লাইয়ারকে গ্রাহকদের সাথে যুক্ত করে দেয়া যায়। তারাই তখন গ্রাহকদের বিকল্প উৎসের সন্ধান দেবে।
এরই মধ্যে সৌদি সরকার অঙ্গীকার করেছে, তারা তাদের জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে, যাতে অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেলের ঘাটতি মেটানো যায়। ওবামা প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন ব্যাংকগুলোকে ওই সব ব্যাংকে গচ্ছিত ইরানি সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা দিয়েছে, যাতে ইরান আর ওই সম্পদকে তার সুবিধামতো অন্যত্র স্থানান্তর করতে না পারে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা রহিমি সাম্প্রতিক অবরোধে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ইরান অবশ্যই এ অবরোধকে অকার্যকর করবে। অতীতেও ইরান তা করেছে এবং জ্বালানি পিপাসার্তদের কাছে ইরান জ্বালানি বিক্রয়ে সক্ষম হয়েছে।
তবে অবরোধ দেরিতে হলেও তার প্রভাব ফেলছে ইরানের জনজীবনে। মুদ্রাস্ফীতি আর ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় বস্তুর মহার্ঘতায় জনজীবন বিপর্যস্ত। ভারত ইরানের তেল-গ্যাস ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ দেশ। দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারক বলেন, ইরানি তেলের ওপর তাদের নির্ভরতা ক্রমেই কমছে, তবু ভারতের জন্য ইরানই তাদের জ্বালানির প্রধান উৎস। ভারত অপরিশোধিত তেলের ১২ শতাংশ ইরান থেকে সংগ্রহ করে। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা যে, দেশটি ‘ইরানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে সেখানে একটি বড় ডেলিগেশন পাঠাচ্ছে,’ তা ওয়াশিংটনকে নারাজ করেছে। ভারতের বাণিজ্যসচিব রাহুল খুলুর গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভারত জাতিসঙ্ঘ আরোপিত অবরোধ বাস্তবায়ন করছে, কিন্তু ইরানে আমাদের প্রেরিতব্য অনেক আইটেমে অবরোধ প্রযোজ্য নয়।
ইরান আইটেম রুপিতে পরিশোধ্য এবং দেশটিতে বিনিময় প্রথায় বাণিজ্য করা যায়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, পাশ্চাত্যের কাছ থেকে এমন চাপ আসার কথা নয় যা ভারতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এমনকি ইরানের সাথে অবরোধের ফাঁকফোকর দিয়ে পাকিস্তানও বাণিজ্যে আগ্রহী। পাশ্চাত্যের সতর্কীকরণ উপেক্ষা করেই পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের সাথে দেশটির গ্যাস পাইপলাইনের কাজ অব্যাহত থাকবে। ওয়াশিংটন বরং ভারতের সাথে গ্যাস পাইপলাইন ইস্যুতে অধিক সফল। প্রেসিডেন্ট বুশের ধমকে ভারত অনেক আগেই আইপিআই থেকে সরে এসেছিল। মুখ রক্ষায় ভারত ওজর দিয়েছিল অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্প পাকিস্তানকেই বেশি ফায়দা দেবে, ভারতকে নয়।
মার্কিন চাপে আরো অনেক বেসরকারি কোম্পানি ইরানের পরিশোধিত তেল ক্রয়ের চুক্তি বাতিল করেছিল। ওবামা প্রশাসন স্বভাবতই ইরানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিস্তৃত করার ভারতীয় সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। তবে সিনিয়র ভারতীয় কর্মকর্তারা ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখার বিষয়ে বেশ জেদি। তারা এমনও উল্লেখ করেছেন পাশ্চাত্য তো সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত ভারতকে অনুনয় করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে একঘরে এবং দেশটির সাথে অর্থনৈতিক লেনদেন বন্ধ করতে। এখন আবার ওই পশ্চিমারাই তাদের নিজ স্বার্থে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে নিজেরাই ছুটছে। ভারতীয়রা মনে করে, এমন পরিস্থিতি আগামী কয়েক বছরে পশ্চিমাদের জন্য ইরানেও বিরাজ করবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

সোমবার, ২১ মে, ২০১২

আফগান নির্বাচন কি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে


ড. তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন ২০০৯-০৮-১৬

অাগামী ২০ আগষ্ট বৃহসপতিবার আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, তালেবানদের ক্ষমতাবৃদ্ধি আর ব্রিটিশ জেনারেল ডেভিড রিচার্ডসের আরও ৪০ বছর আফগানিস্তানে থাকার অভিপ্রায়ের মধ্য দিয়ে এ নির্বাচন যে কোনো বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কোনো কোনো মহল থেকে আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার স্বার্থে তালেবানদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে নির্বাচিত পেরসিডেন্ট সে ব্যাপারে কী ভূমিকা নেন, তা নিয়ে আগ্রহ থাকবে অনেকের। গত প্রায় ৩০ বছর আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। যুদ্ধ, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, সংঘাত এখন আফগানিস্তানের নিত্যসঙ্গী। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটি দখল করে নিয়েছিল। আর তার ঠিক ২২ বছর পর সেই একই ডিসেম্বর মাসে আফগানিস্তান 'দখল' করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। আজও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী আছে। আছে ন্যাটো বাহিনীও। কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা, সেই গৃহযুদ্ধ আজও চলছে। শুধু যুদ্ধের পক্ষগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটি দখল করে সোভিয়েত রাজনীতি সমর্থিত কমিউনিষ্ট পার্টির (পারচাম) নেতা বারবাক কারমালকে সেখানে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। এরপর ক্রেমলিন নেতৃত্ব ক্ষমতায় বসিয়েছিল ডা. নাজিবুল্লাহকে। উদ্দেশ্য তৎকালীন যুদ্ধরত মুজাহিদীনদের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় গিয়ে তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। বৃহৎ শক্তির সেই ষ্ট্যাটেজিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র খুঁজে পেয়েছিল 'আরেক বারবাক কারমাল' হামিদ কারজাইকে। ২০০১ সালের ২২ ডিসেম্বর কারজাই আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আর ২০০৫ সালে তথাকথিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। সেই অর্থে আগামী ২০ আগষ্ট যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কারজাই আবারও প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আফগান জনগণের জন্য আদৌ কি কোনো অর্থ বহন করে? এর জবাব সম্ভবত না। কেননা গত ৩০ বছরের যুদ্ধে কাবুলের মসনদে শক্তির পরিবর্তন হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য যে এতটুকু নিরাপত্তা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউই। এক সময় সোভিয়েত শাসকরা বারবাক কারমালকেও সরিয়ে দিয়েছিল। আর এখন হামিদ কারজাই কখন ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন সেটাই দেখার বিষয়। অতীতে বারবাক কারমালকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি তৈরি করেছিল। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সিআইএ হামিদ কারজাইকে তৈরি করেছিল আফগানিস্তানের পরবর্তী নেতা হিসেবে। নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে (৪ আগষ্ট, ২০০৯) এলিজাবেথ রুবিন লিখিত এক প্রবন্ধে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৯২ সালে মুজাহিদীনদের নেতৃত্বে কাবুলে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সরকারে হামিদ কারজাই ছিলেন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তালেবানদের কাবুল দখলের (১৯৯৫) আগেই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কারজাইকে জেলে পাঠানো হয়েছিল (১৯৯৪)। পরে জেল থেকে পালিয়ে তিনি পাকিস্তান চলে যান। সিআইএ সেখানেই তাকে রিক্রুট করে। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর ঘটনাবলীর পর তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাহাড়ি উপজাতিদের উদ্বুদ্ধ করতে সিআইএ কারজাইকে ব্যবহার করেছিল। এক পর্যায়ে তালেবানদের একটি গোষ্ঠীর হাতে বন্দিও হয়েছিলেন কারজাই। তখন সিআইএ'র একটি 'সেপশাল মিশন' তাকে উদ্ধার করে পাকিস্তান নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে তিনি সিআইএ'র 'প্রিয়মানুষ'। তবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'র সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কারজাই ভারতে পড়াশোনা করেছেন। ভারতে থাকাকালেই তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরে পড়েন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কারণেই কারজাই কাবুলে ক্ষমতাসীন হয়েছেন এবং এই দুই শক্তির স্বার্থ যতদিন তিনি রক্ষা করবেন, ততদিনই তিনি থাকবেন ক্ষমতায়। কারজাই তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এরই মধ্যে ড্রাগ মাফিয়াদের নিয়ে একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন, যাদের পরামর্শেই মূলত তিনি ক্ষমতা চালাচ্ছেন। কান্দাহার প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ মূলত তার সৎ ভাই আহমেদ ওয়ালি কারজাইর হাতে। ওয়ালি আফগানিস্তানের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এই অবৈধ ব্যবসা মূলত তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। ওয়ালির পাশাপাশি রয়েছেন হেলমন্দ প্রদেশের সাবেক গভর্নর মোর মোহাম্মদ আখুনজাদা, জেনারেল দোস্তাম, মোহাম্মদ ফাহিম ও মোহাক্কিকের মতো যুদ্ধবাজ নেতারা। আখুনজাদা নিজেও আফিম ব্যবসায়ী। দোস্তাম অন্যতম যুদ্ধবাজ ও উজবেক উপজাতির লোক। তিনি নিজে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের নেতা। ফাহিম তাজিক, সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও বর্তমানে কারজাইয়ের রানিং মেট। মোহাক্কিক হাজারা উপজাতির লোক ও অন্যতম যুদ্ধবাজ। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব বাহিনী রয়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রচুর অসত্রশসত্র। এসব যুদ্ধবাজকে নিয়েই একটি চক্র গড়ে তুলেছেন কারজাই। আর এই যুদ্ধবাজদের অসেত্রর অন্যতম উৎস হচ্ছে মাদক বিক্রির টাকা। এ টাকা দিয়ে তারা অসত্র ক্রয় করেন। হিলারি ক্লিনটনের ভাষায়-আফগানিস্তান তাই পরিণত হয়েছে অন্যতম ?ঘধৎপড় ংঃধঃব?-এ। অর্থাৎ মাদক রাষ্ট্র, যেখানে সর্বোচ্চ প্রশাসনের ইঙ্গিতে মাদক বিকিকিনি হয়। রাষ্ট্র এই বিকিকিনি অনুমোদন করে। টিআই'র রিপোর্ট অনুযায়ী আফগানিস্তান বিশ্বের পঞ্চম দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র। দুর্নীতির পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আফগানিস্তানে একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একাধিক প্রতিবেদনে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঘানি, যিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি অর্থমন্ত্রী ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দুর্নীতির একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০০৮ সালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব জমা হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার (৪০ মিলিয়ন আফগানি)। অথচ এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আদায় হয়েছে, যা কোষাগারে জমা হয়নি। ঘানি এ জন্য দায়ী করেছেন ওই চক্রকে, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ?কধৎুধর ওহপড়ৎঢ়ড়ৎধঃবফ? হিসেবে। অর্থাৎ একটি মাফিয়াচক্র কারজাইকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। কারজাইর পরিবারও বৈধ-অবৈধ সব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সৎ ভাই ড্রাগ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। আরেক ভাই মাহমুদ নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যাংক ও রিয়েল এষ্টেট ব্যবসা। আফগানিস্তানের টয়োটার ৫০ ভাগ শেয়ার মাহমুদের। কান্দাহারের মানুষ কারজাই। 'কান্দাহারি পশতুন' হিসেবেই তিনি পরিচিত। বাবা ছিলেন গোত্রপ্রধান। ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানে আততায়ীর হাতে তিনি নিহত হন। কারজাই নিজের অবস্থানকে ধরে রাখার জন্য সিআইএ প্রণীত ফর্মুলা অনুসরণ করে চলেছেন। এই ফর্মুলায় যুদ্ধবাজরা আজ তার মিত্র। উত্তরে জেনারেল দোস্তাম ও কান্দাহারে যুদ্ধবাজ নেতা সিরাজী যেমনি তার 'বন্ধু'; ঠিক তেমনি হেরাতের আরেক যুদ্ধবাজ নেতা ইসমাইল খানও তার 'বন্ধু'। তিনি যুদ্ধবাজ নেতাদের স্বার্থরক্ষা করেই কাবুলে নিজের ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। ডোনাল্ড রামসফেল্ড এই ফর্মুলাকে চিহ্নিত করেছেন ?ওৎববহ ড়হ ওৎববহ ংরঃঁধঃরড়হ? হিসেবে। এর অর্থ হচ্ছে ?ভৎরবহফষু ংড়ষফরবৎ ধমধরহংঃ ভৎরবহফষু ংড়ষফরবৎ?। কারজাই এসব যুদ্ধবাজ নেতাকে নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখতেই শুধু দেননি, বরং অবৈধ মাদক ব্যবসা ও নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও সুবিধা দিয়েছেন। এ কারণে ভবিষ্যৎ আফগান রাষ্ট্রের কল্পনা করাও কঠিন। এর মধ্যেই আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলাদা প্রশাসন, যেখানে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্থায়ীভাবেই যুদ্ধবাজ নেতারা অনেকটা 'স্বাধীন'। অসত্র ও মাদক এখন আফগানিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ২,৫১,৮২৫ বর্গমাইলের যে বিশাল পাহাড়ি এলাকা, সেই পাহাড়ি এলাকা আবার ৩২ প্রদেশে বিভক্ত। প্রতিটি প্রদেশেই রয়েছে একাধিক যুদ্ধবাজ নেতা, যারা স্থানীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। কোথাও কোথাও এসব যুদ্ধবাজ নেতা আবার তালেবানদের মিত্র। জনসংখ্যার মাঝে পশতুন (৩৮ ভাগ) এর প্রাধান্য বেশি। এরপর রয়েছে তাজিক (৩৫ ভাগ), হাজারা (১৯ ভাগ) ও উজবেকদের (৬ ভাগ) প্রাধান্য। কারজাই নিজে পশতুন হলেও, ভুলে গেলে চলবে না তালেবানদের মাঝেও পশতুন গোষ্ঠীর বড় প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ঘানি ও আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এক সময় প্রয়াত যুদ্ধবাজ নেতা শাহ আহমেদ মাসুদের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। এরা খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। যে কারণে কারজাই শেষ পর্যন্ত 'বিজয়ী' হবেন। কিন্তু তারপর? শান্তি ও স্থিতিশীলতা সেখানে কীভাবে নিশ্চিত হবে? 'যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র' এর অপবাদ থেকে কি আফগানিস্তান বেরিয়ে আসতে পারবে কখনও? আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সেখানকার সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পারবে না। সমাধানের একমাত্র পথ হতে পারে তালেবানদের সঙ্গে সহাবস্থান। তালেবানরা আজ আফগানিস্তানের অন্যতম শক্তি। এদের সঙ্গে 'সংলাপ'-এ যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের ধর্মীয় নেতারা একটা বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা সহাবস্থানের একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। 'লয়া জিরগা'য় তালেবান নেতাদের স্থান দিয়ে তাদের আস্থায় নেয়া যায়। জিমি কার্টার কিংবা বিল ক্লিনটনের মতো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সম্প্রতি যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন, এদের আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। শুধু ধর্মীয় নেতারাই গ্রহণযোগ্য হবেন। ব্রিটিশ জেনারেল রিচার্ড (যিনি সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নেবেন) ২০৫০ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে থাকার যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, তা একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এতে করে বরং জটিলতা আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওবামা প্রশাসন আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে যদি এমনটি করে তাহলে তিনি ভালো করবেন। এক্ষেত্রে জেনারেল ষ্ট্রানলে ম্যাকরিষ্টাল (যিনি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী প্রধান) একটি ভূমিকা পালন করতে পারেন। তার রিপোর্ট ওবামা প্রশাসনকে সিদ্ধান নিতে সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে গত ৩০ বছরের যুদ্ধে কোনো পক্ষই 'জয়ী' হয়নি। কিন্তু দেশটি ধ্বংস হয়ে গেছে। হামিদ কারজাই দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হবেন সত্য, কিন্তু যুদ্ধ তো বন্ধ হবে না। তাই নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে ওবামা প্রশাসন কি সত্যি সত্যিই আফগান যুদ্ধের অবসান চান? এর জবাবের জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। 

সিরিয়া সংঘাতের সারসংক্ষেপ


ড. আহমদ আনিসুর রহমান  

সিরিয়া নিয়ে আমরা সকলেই শংকিত। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকে অস্ত্রবলে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখার পর সেখানকার আলবী-শিয়া গোষ্ঠীগত স্বৈরাচারী সেনাবাহিনীর হাল সময়ের খুনখারাবি আন্তর্জাতিক আইনের সংকীর্ণ সংজ্ঞায়ও গণহত্যার শামিল। এ’ত গেল মানুষ হিসেবে সিরিয়ার মানুষের অবস্থা নিয়ে উত্কণ্ঠা। এটাই বড়। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়ার পরিস্থিতি যে সিরিয়ার বাইরেও মধ্যপ্রাচ্য এবং তার মাধ্যমে বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে তা’ও এক বড় চিন্তার বিষয়। এই পরিস্থিতি বোঝা প্রয়োজন।
প্রথমেই বুঝতে হবে ‘সিরিয়া’ একটি কৃত্রিম সৃষ্টি। সিরিয়া বলে কোন দেশ-জাতি কখনোই ছিল না। সরলমতি আরবদের ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’-র মত প্রতারক ও বিভিন্ন কূটনৈতিক ভেল্কীর মাধ্যমে প্রতারিত করে সেকালে সারা মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অভিভাবক-শাসক রক্ষাকবচ রূপ ‘ওসমানীয় খেলাফত’-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উস্কে দেয় ইংরেজ ও ফরাসী ঔপনিবেশিক শক্তিরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। ‘খেলাফতের অর্থনৈতিক শক্তির ওপর দখল বাগিয়ে নেয়া স্পেন ও হল্যান্ড থেকে আসা বিজাতীয়রা তাদের কলকাঠি নেড়ে খলিফার সরকারকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের নিজেদের ভেতরকার বিশ্ব দখলের বখরার ভাগাভাগি নিয়ে কামড়া-কামড়ির যে যুদ্ধকে তারা পরে ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করে-তাতে যোগ দিতে প্ররোচিত করে। এভাবে বাইরে থেকে ইউরোপীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ আর ভেতর থেকে আরব জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয় ‘খেলাফত’কে। তার একমাত্র সহায়ক হতে পারতো যে ভারতবর্ষীয় মুসলমান-যারা আঁটঘাট বেঁধে খেলাফত রক্ষায় যুদ্ধে আসতে প্রস্তুত হচ্ছিল, তাদের নিরস্ত্র করা হয় ভারতীয় মুসলমানদের রাজনীতির নিয়ামক শিক্ষাপীঠ দেওবন্দ মাদ্রাসার গুরুজনদের ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্যে বিশাল জমি ইত্যাদি দিয়ে যুদ্ধে খলিফার পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে রাজি করিয়ে। এমতাবস্থায় খেলাফত ধ্বংস করা হলে আরবদের প্রায়শ্চিত্তরূপেই যেন আজকে যে এলাকাকে সিরিয়া বলা হচ্ছে, তত্সহ প্রায় সমগ্র আরব বিশ্বই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইঙ্গ-ফরাসী দখলদারিত্বে নিপতিত হয়। আরব বিশ্বের উত্তর-পশ্চিমাংশ হলো ঐতিহাসিকভাবেই ‘শাম’ দেশ, উত্তর-পূর্বাংশ ‘ইরাক’। ‘শাম’ দেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ইংরেজ আর ফরাসীরা নিজেদের ভেতর ভাগ করে নেয়। ‘শাম’-এর উত্তরাংশ নেয় ফরাসীরা-সেখানে নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থে সৃষ্টি করে দুই কৃত্রিম ‘রাজ্য’-‘সিরিয়া’ আর ‘লেবানন’। ‘শাম’-এর দক্ষিণাংশ ইংরেজরা দখল করে সেখানে আবার কৃত্রিম দু’ ‘রাজ্য’-‘জর্ডন’ আর ‘ফিলিস্তিন’ তৈরি করে। চারটে কৃত্রিম রাজ্যকেই প্রকৃত প্রস্তাবে স্ব-স্ব উপনিবেশ হিসেবে দখল করে ইংরেজ আর ফরাসীরা।
‘সিরিয়া’ নামে কৃত্রিম রাজ্য সৃষ্টির পেছনে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের উদ্দেশ্য আর মানসিকতাটি ঐ নবসৃষ্ট কৃত্রিম রাজ্যটির সিরিয়া নামকরণ থেকেই বোঝা যায়। চাইলে তারা তাকে উত্তর ‘শাম’ বলতে পারতো-উত্তর আয়ার্ল্যান্ড-এর উদাহরণ ত’ ছিলই। না হলে মধ্যপ্রাচ্যের রীতি অনুযায়ী এলাকার প্রধান শহরের নামে পুরো এলাকাটিকেই ‘দামেস্ক’ রাজ্য বলতে পারতো, তা না করে বহু প্রাচীন ইতিহাসের আঁস্তাকুড় থেকে ‘অ্যাসিরিয়া’ শব্দটি বের করে তা থেকে সিরিয়া নামের উদ্ভাবন করে, তা দিয়ে এই খণ্ডিত ‘শাম’-কে নামাঙ্কিত করে। উদ্দেশ্য ছিল বদ। ‘শাম’ নামটির সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের প্রায় দেড় হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্য এবং দামেস্ক নামের সঙ্গে ঐ ঐতিহ্য ছাড়াও তারও পূর্বের আরো অর্ধসহস্র বছরের খ্রীস্টান ঐতিহ্যের সম্পর্ক আছে, সে ঐতিহ্যে জাত্যাভিমান, জাতীয় পরিচয় ও অহংবোধ আছে। তাকে ভেঙে ফেলবার, ভুলিয়ে দেয়ার জন্য দু’ হাজার বছরেরও পুরনো খ্রীস্টান-মুসলিম আরব ঐতিহ্যের পূর্বে পৌত্তলিক অসুরীয়দের নাম তুলে এনে উত্তর ‘শাম’-বাসীকে ঐ পরিচয়ে পরিচিত হতে অভ্যস্ত করাবার প্রচেষ্টা হয়। উপনিবেশবাদীরা কৌশলে এই কাজটি পারস্যের সঙ্গেও করে-হিন্দুস্তানের সঙ্গেও। সে প্রসঙ্গে এখন যাব না। খেলাফত ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ শাসক, খলিফা-সুলতান স্বাধীন স্বেচ্ছাচারের অধিকারী ছিলেন না। তাকে তিন মহাদেশের বিশাল এলাকার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক হওয়া সত্ত্বেও কোরআন-কেতাবে বর্ণিত ন্যায়-নীতির বহুবিধ আদেশ-নিষেধের গণ্ডির ভেতর থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে হতো। আর এসব নিয়মনীতির সর্বোচ্চ যেই পণ্ডিতকে সরকারিভাবে ‘শায়খুল-ইসলাম’ বলা হতো-সারা বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মগুরুরূপ সেই জ্ঞানর্ষির নির্দেশনাধীন থেকেই তাকে এবং সকল প্রজাকে চলতে হতো। খেলাফত ধ্বংস হওয়ার পূর্বে সর্বশেষ যে শায়খুল ইসলাম ছিলেন তিনি ছিলেন ‘শাম’-দেশবাসী, তাই তাকে বলা হতো ‘ইমাম শামী’। রাজনৈতিক ঔপনিবেশিক স্বার্থেই ফরাসীদের তখন এই ‘ইমাম শামী’কেও জনগণের মন থেকে মুছে ফেলবার দরকার ছিল-তার জন্যও ‘শাম’ নামটা মুছে ফেলে ‘সুরিয়া’ (আরবীতে) বা ‘সিরিয়া’ (ফরাসী/ইংরেজিতে) নামটি চালু করা হয়। এই নামকরণটি আপাতদৃষ্টে একটি ছোট বিষয় হলেও গভীরতর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সে সময় ইউরোপে ফ্রয়েড ও য়ুং এই গভীরতর মনস্তত্ত্ব (Depth Psychology) আবিষ্কার করেছিলেন এবং ইউরোপীয় শাসকরা তার গুরুত্ব যথাযথ অনুধাবন করেছিল। এই ধরনের নামকরণের মাধ্যমে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকরা যেভাবে একদিকে দখলকৃত উপনিবেশসমূহের জনসাধারণের অবচেতনার পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়, সেভাবেই তা খোদ তাদেরও মন-মানসিকতার পরিচয় দান করে, প্রচ্ছন্নভাবে। এই মনমানসিকতা থেকেই তারা নবসৃষ্ট উপনিবেশ সিরিয়ার শাসন-শোষণে স্থানীয় সংখ্যালঘুকে বিপুলতর সংখ্যাগুরুর ওপর সশস্ত্র বলসহ প্রতিষ্ঠা করে-যার সুদূরপ্রসারী আজকের এই তথাকথিত ‘সিরীয়’ সংকট।
‘সিরিয়া’র বিশালতর সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী আরব সুন্নি মুসলমান-প্রায় সকলেই হানাফী মজহাব অনুসারী, অধিকাংশই সম্ভবত কাদেরিয়া তরীকাপন্থি। কিছু শাফেরী আর নকশবন্দী আছেন ঐ বৃহত্তর আরব-সুন্নি পরিচয়ধারী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভেতর। ঐ বিশালতর সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরে খুবই ক্ষুদ্রাকৃতি তিনটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যারা খেলাফত ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিভাবকরূপ খলিফার আশ্রিত রূপে নিরাপদ ও সচ্ছল ছিলেন-সেই দেশীয় খ্রীস্টীয় আর আলবী-শিয়াদের এবার ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্যোগী হয়। ঔপনিবেশিক ও নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি চিরকালেই সবদেশেই এভাবে সংখ্যালঘুকে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবার ষড়যন্ত্র করে থাকে।
উত্তর ‘শাম’-এ এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ফরাসীরা একদিকে দেশীয় খ্রীস্টানদের দেশের পশ্চিম উপকূলে এক জায়গায় জড়ো করে তারা ঐ স্থানীয় ক্ষুদ্র এলাকায় ৩০%-এর মত হলেই ঐ এলাকাকে ‘লেবানন’ নাম দিয়ে আলাদা আরেক কৃত্রিম রাজ্য তৈরি করে সেখানে খ্রীস্টান-মুসলিম ক্ষমতা ভাগাভাগির নামে সেখানে সবসময় নিজেদের বশংবদ এক খ্রীস্টান সরকার বা খ্রীস্টান নিয়ন্ত্রিত সরকার বসাবার ব্যবস্থা করে-সিরিয়দের লুটেপুটে খাওয়ার, আর ‘দরকার’ মত সেখানে সৈন্য নামাবার জন্য উপকূলের দখল পাকাপোক্ত করে। ইংরেজরা ঠিক একইভাবে দক্ষিণ ‘শাম’-এর উপকূল দখলের স্থায়ী ব্যবস্থা করে, ফিলিস্তিন ভাগাভাগি করে।
একই সঙ্গে ঐ খ্রীস্টান সংখ্যালঘুদের একাংশ দিয়ে ‘সিরিয়া’র ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক দল—‘বাথ’ পার্টি প্রতিষ্ঠা করিয়ে তাকেই সিরিয়ার জনগণের ‘অধিকার’ আদায় আর অধিকার রক্ষার হর্তাকর্তা সর্বেসর্বা সাজিয়ে বসায়। এটা হলো স্থানীয় জনগণের অধিকার আদায়ে সকল চেষ্টা চরিত্রকে আগে থেকেই ‘টীকা’ দিয়ে  ঠেকিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টার মত। ঔপনিবেশিক শক্তিরা তাদের সকল উপনিবেশেই এভাবে সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার আদায় ও রক্ষার ঠিকাদারী দিয়ে প্রগতিশীল সাজিয়ে সামনে দাঁড় করায়। একই সঙ্গে আলবী-শিয়া যারা সহজেই মুসলমান সেজে বিপুলতর সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে একাকার হয়ে তাদের একজন সেজে যেতে পারবে, তাদের হাতে দিয়ে দেয় প্রকৃত ক্ষমতা—তাদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের মাধ্যমে। সিরিয়ার সাধারণ জনগোষ্ঠীকে এভাবে ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী আর বিরোধী পক্ষ সাজা ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক দল—উভয় থেকে বাইরে রেখে একেবারেই অক্ষম করে ফেলা হয়। আলবী-শিয়ারা হজরত আলীকে আল্লাহর অবতার বিশ্বাস করে এবং এই বিশ্বাসকে অস্বীকারকারী খাঁটি একেশ্বরবাদী মুসলমানদের সঙ্গে শুরু থেকেই কঠোর শত্রুতা পোষণ করে। তাদের বিশ্বাস মতে দুনিয়ার গর-শিয়া তাবত্ মুসলমানই আসলে ‘জিনিক’— মুসলমান সাজা ‘কাফের’ এবং আহলে কেতাব খ্রীস্টানদের সঙ্গে  মিলে এই জিন্দিকদের নিধন বা নিদেনপক্ষে দমন ধর্মের বাধ্যতামূলক কার্যের অন্তর্ভুক্ত।
এইরূপ পরিস্থিতিতে ১৯১৯ সনে ফরাসীদের এসে ‘শাম’ কেটে ‘সিরিয়া’ সৃষ্টির পর থেকে প্রায় এক শতাব্দী ধরেই সংখ্যালঘু খ্রীস্টানসৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক আলবী-শিয়া সেনাবাহিনী মিলে সমগ্র বৃহত্তর সুন্নি মুসলমান আরব জনগণকে দমন-নিপীড়নে সর্বস্বান্ত করে পুরো সিরিয়াকে একটি দাসশিবির করে রেখেছিল। মাঝেমধ্যে স্পার্টাকাসের মত কোন কোন সিরীয় মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করলে তাদের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে—দরকার মনে হলে তাদের পুরো শহরটিকে বোমাবর্ষণে নিস্তব্ধ করে দেয়া হয়। ঐ অতি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু শাসক চক্র যখনই উপলক্ষ হয়েছে, তখনই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিপক্ষে বিদেশি ‘আহলে কেতাব’ বা শিয়াদের সঙ্গে প্রকাশ্যে বা গোপনে এক হয়ে কাজ করেছে।
জগতের মুসলমানদের মতই সিরিয়াবাসীদেরও বিশ্বাস, বিশ্বে অত্যাচার-নিপীড়ন যখন চূড়ান্তে পৌঁছবে তখন ত্রাতা হিসেবে হিজজে মদীনা শরীফে ইমাম মাহদী আর শামে দামেস্কে ঈসা-মসীহর আবির্ভাব হবে এবং তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জগতে আবার ন্যায় ও শান্তির যুগ সূচিত হবে। দামেস্কের মসজিদের মীনারে ঈসা-মসীহ অবতীর্ণ হবেন। যে অত্যাচার-নিপীড়নের চূড়ান্তে আজ ‘সিরিয়া’বাসীর জীবন অসহনীয় হয়ে পড়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘সিরিয়া’র-ই রাজধানী দামেস্কের ঐ মসজিদের মীনারের দিকে নজর ফেলে ‘সিরিয়া’বাসী যে এতোদ্বয়ের আবির্ভাবের সময় এসেই পড়েছে মনে করে সাহস করে মরীয়া হয়ে উঠে দাঁড়াবে—তাই স্বাভাবিক। সেইটি হচ্ছে। তাতে যে সংঘাতের উদ্ভব, তাতে দেশি-বিদেশি কোন পক্ষ কী ভূমিকা আসলেই নেবে—তা ওপরের বিশ্লেষণের আলোকেই আন্দাজ করা যাবে।
n লেখক : ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব শিক্ষক, প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রনীতি এবং
রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ।

ইরানের পারমাণবিক ইস্যু : বাগদাদ সম্মেলন সফল হওয়ার পূর্বশর্ত


মুহাম্মদ রুহুল আমীন

ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে আগামী ২৩ মে বাগদাদে চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মধ্য এপ্রিলের ইস্তাম্বুল বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসন্ন বাগদাদ সম্মেলন ব্যর্থ হলে উপসাগরীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা পৃথিবীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান শান্তিপূর্ণ জাতীয় নীতির আওতায় বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং অন্যান্য শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তার বহুল আলোচিত পারমাণবিক কর্মসূচি হাতে নেয়। নতুন এ কর্মসূচি গ্রহণ করার অব্যবহিত পর ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে অধিকাংশ দেশের সঙ্গে বৈরী-সম্পর্কের অধিকারী ইসরাইল আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির আশঙ্কা প্রকাশ করে। সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী ইউরোপ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য সব ধরনের উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।
পরমাণু ইস্যুতে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমনের নিমিত্তে ইরান বারবারই জাতিসংঘসহ বিশ্ব ফোরামগুলো এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক পর্যায়ে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য উপস্থাপন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা ইরানের বক্তব্যে কোনোভাবে স্বীয় অবস্থান পরিবর্তন না করে আগের তুলনায় আরও কঠোরভাবে ওই ইস্যু মোকাবিলার চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।
পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলো মূলত ৫ ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। এক. যুক্তরাষ্ট্রের ও ইউরোপের চিরমিত্র ইসরাইলকে দিয়ে ইরানের প্রতি যুদ্ধহুমকিসহ বিভিন্ন চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করা। দুই. আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে ব্যবহার করা। তিন. ইরানের অভ্যন্তরে জাতীয় ঐক্য বিনাশের চেষ্টা করা। চার. ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও পারমাণবিক স্থাপনায় গোপন হামলা পরিচালনা করা। পাঁচ. ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বৈশ্বিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
সত্তর দশকের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নতুন জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী এবং তার মধ্যপ্রাচ্যের অনুচররা সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আশির দশকে ভ্রাতৃপ্রতিম ইরাককে ক্ষেপিয়ে দেয়া হয় ইরানের বিরুদ্ধে এবং প্রায় এক দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে নতুন মতাদর্শের এ দেশটি প্রায় শ্মশান হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ইরানকে মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ও কালো তালিকাভুক্ত করে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এক ঘরে করার কৌশল অবলম্বন করা হয়।
স্বীয় রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইরানের ঐতিহ্যিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা অতিসতর্কতার সঙ্গে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তিধর রাষ্ট্রসহ উন্নত পুঁজিবাদী ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যত্র তাদের তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আস্তে আস্তে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় এলাকার সুস্থ রাজনৈতিক এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতির এক নিয়ত সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে ইরান বিশ্ব মানচিত্রে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়।
বিভিন্নভাবে দমন করায় কৌশলে ব্যর্থতার পর পাশ্চাত্য ও তার বন্ধুরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইরানকে পর্যুদস্ত করার অপর এক কৌশল অবলম্বন করে। জাতিসংঘকে ব্যবহার করে জাতিসংঘের পারমাণবিক কুত্তাপাহারা (nuclear watchdog) নামক আইএইএ সংস্থার মাধ্যমে কয়েকবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করা হয় এবং প্রতিবারই আইএইএ হাস্যকর ও ভয়ঙ্কর পারমাণবিক প্রতিচ্ছবি প্রদান করে।
এ পর্যন্ত কয়েক দফায় জাতিসংঘ ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে এবং ঘোষিত পারমাণবিক পরিকল্পনা ত্যাগ করতে বিশ্ব সংস্থার সফল কূট-কৌশল প্রয়োগ করা হয়। জাতিসংঘের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও কয়েকবার বাণিজ্য অবরোধ এবং মুদ্রা অবরোধ ও ব্যাংক অবরোধের মতো সংবেদনশীল নিষেধাজ্ঞার নির্লজ্জ কৌশল গ্রহণ করে। ইইউ রাষ্ট্রগুলো ইরানী তেল ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য বিরোধের ঘূর্ণায়মান বলয় গড়ে তোলে, যাতে ইরান কাঠামোগত আন্তঃঅবরোধের (structural interlockimg) যাঁতাকলে পিষ্ট হয়।
জাতিসংঘের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ দেশগুলোও ইরানের ওপর ব্যাংক অবরোধ এবং তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে অচল করে দেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য বিশ্বের ইরান-বিরোধী এসব পদক্ষেপ ইরানকে বিভিন্নভাবে বেকায়দায় ফেললেও পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য এখনও যে অবাস্তবায়িত রয়েছে তা স্পষ্ট।
পাশ্চাত্যের চ্যালেঞ্জের মুখে ইরান সম্ভবত কালক্ষেপণ করার কৌশল বেছে নিয়েছে। সময় সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক—এ গুরুবাক্যটি হয়তো ইরানিরা প্রয়োগ করছে সর্বাংশে। ইরানের সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজি হলো, পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখা। এ পর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে, সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ইরান সরকার, ইরানের রিভলুশনারি গার্ড, স্বেচ্ছাসেবক সৈনিক, ইরানি জনগণ সবাই পারমাণবিক ইস্যুতে নজিরবিহীনভাবে ঐক্য গড়ে তুলেছে, যাতে ফাটল ধরানো সম্ভব হবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
ইরানের দ্বিতীয় কৌশল হলো—ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেল রফতানির বিকল্প বের করা এবং এরই মধ্যে চীন ও তুরস্কের মাধ্যমে ইরান তার এ কৌশল বাস্তবায়নে বেশ সফল হচ্ছে। ইরানের আরেকটি কৌশল হলো—যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং ইরানের ব্যবসায়ী পার্টনার রাষ্ট্রগুলোকে ইরানি তেল ক্রয়ে অনড় অবস্থানে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশীয় মিত্র ভারত এরই মধ্যে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে ইরান থেকে তেল ক্রয় কোনোভাবে বন্ধ করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এশীয় মিত্র জাপানও সুনির্দিষ্টভাবে তেল ক্রয় হ্রাস করার ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে কিছু জানায়নি।
এ পর্যন্ত সংঘটিত সব ঘটনার বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট, ইরানের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের আরোপিত কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না। এমনি প্রেক্ষাপটে আসন্ন বাগদাদ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ছয়টি পরাশক্তিধর রাষ্ট্র এবং তাদের শত প্রশ্ন, কৌশল ও আক্রমণের মুখে সম্মেলনে আসছে পারমাণবিক কর্মসূচির ধারক উপসাগরীয় ইরান।
বাগদাদ বৈঠকের সফলতার কতকগুলো পূর্বশর্ত রয়েছে। প্রথমত, ইরান ও পাশ্চাত্যের দাবির যৌক্তিকতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম-অধিকারের নীতির নিক্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশ্চাত্যের দাবি হলো—ইরান তার পরমাণু কর্মসূচিতে ২০ শতাংশ স্থিতি ফিরিয়ে আনুক। এর পাল্টা দাবি উত্থাপন করেছে ইরান। তাদের শর্ত হলো—তেল রফতানি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর পুরনো ও নতুন আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। ইরানের এ দাবি কতটুকু, কী মাত্রায় এবং কীভাবে পাশ্চাত্যপক্ষ মূল্যায়ন করবে তার ওপর নির্ভর করবে বাগদাদ বৈঠকের সাফল্য-ব্যর্থতা।
দ্বিতীয়ত, এর আগে অনুষ্ঠিত সব বৈঠকে ইরান একই দাবি বারবার জানিয়ে এসেছে। একবিন্দুও ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসেনি। অন্যদিকে পাশ্চাত্যও একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে আসছে নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতরভাবে। এভাবে এক অচলাবস্থা জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে এ ইস্যুকে ঘিরে।
এ অবস্থায় দু’পক্ষকেই তার অনড় অবস্থা থেকে একটু সরে এসে ‘জয় জয় কৌশল’ (win-win strategy) অবলম্বন করলে আসন্ন বাগদাদ সম্মেলনে সফল হতে পারে।
তৃতীয়ত, আইএইএ জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিষ্ঠান, যার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রগুলোর পারমাণবিক অস্ত্রায়ন পর্যবেক্ষণ করা। এই প্রতিষ্ঠানের রীতি-নীতিতে একটা রাষ্ট্র কী ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে তার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আইএইএ’র বিধি-বিধান পর্যালোচনাপূর্বক ইরানের দাবির যথার্থতা পরীক্ষা করা।
চতুর্থত, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিরক্ষায় শুধু একতরফা অস্ত্রায়ন নিরোধ গ্রহণযোগ্য সমাধান বয়ে আনতে পারে না। ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইলকে পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত রেখে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার দ্বৈতনীতি ফলপ্রসূ হতে পারে না।
পঞ্চমত, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিসাম্য বজায় রেখে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ইসরাইল ও ইরান উভয়ের পারমাণবিক অস্ত্রায়নের পথ থেকে নিবৃত করার সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালনই কেবল আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে কার্যকর হতে পারে।
বাগদাদ বৈঠকের সাফল্যের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তি নির্ভর করছে। সে কারণে ওই বৈঠকের সফলতার পূর্বশর্তগুলো বিবেচনায় রেখে পঞ্চ বৃহত্শক্তি রাষ্ট্রগুলোর এর আগের ইস্তাম্বুল বৈঠকের অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবমুখী নীতি অনুসরণে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত। ইস্তাম্বুল বৈঠকে ইরানের কঠোর অবস্থান এবং পাশ্চাত্যের হুমকি-ধমকি যেমন কোনো সমাধান বয়ে আনেনি, তেমনি অবিবেচনামূলক, অবিচারমূলক, অযৌক্তিক, অনৈতিক এবং একপেশে পাশ্চাত্য দ্বৈতনীতি বাগদাদ সম্মেলনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, সিআইডিএস
mramin68@yahoo.com