শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৩

জার্মানি ও মুসলিম ব্রাদারহুড


বুধবার, ০৭ অগাস্ট ২০১৩, ০২:৪৭ অপরাহ্ন


মূল : গুইদো স্টেইনবার্গ হ অনুবাদ : মাসুম বিল্লাহ

[মিসরের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় দৃশ্যত সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুহাম্মদ মুরসি। একবিংশ শতাব্দীতে আরব বিশ্বে ইসলামি দলগুলোর উত্থান নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি কৌতূহলেরও শেষ নেই। মুরসির ক্ষমতাচ্যুতিকে আমেরিকা বিভিন্নভাবে সমর্থন দেয়ার চেষ্টা করলেও ইউরোপের দেশগুলো এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এর অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্র ও ন্যাটোর সদস্য জার্মানি। কেন দেশটির এই অবস্থান? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন পররাষ্ট্র বিষয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গুইদো স্টেইনবার্গ। আজ এর দ্বিতীয় পর্ব] জার্মান সরকারের প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো জার্মানির মাটিতে ব্রাদারহুডের উপস্থিতিকে সংগঠনটির প্রতি বার্লিন সরকারের নীরব সমর্থন হিসেবে গণ্য করলেও ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত জার্মানি এ ব্যাপারে কখনোই তেমন মনোযোগ দেয়নি। এর মূল কারণ ছিল সম্ভবত ইসলামি সংগঠনগুলোর তাৎপর্য অনুধাবনের অভাব। মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যাপারে জার্মানির নীতি পর্যবেক্ষণকারী একজন প্রবীণ কূটনীতিকের মতে : সেখানে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, ব্রাদারহুড এবং তাদের সরকারগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাতে জার্মানির কিছু করার নেই এবং এগুলো ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধ’। সেখানকার নীতি নির্ধারকেরা ইসলামি আন্দোলনগুলোর তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হন। কারণ ধর্মকে অনুন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং ইসলামপন্থীদের মনে করা হতো পশ্চাৎপদ। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী সরকারগুলোকে আধুনিকায়নের উপাদান হিসেবে তারা বিবেচনা করত। জার্মানি ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থীদের তৎপরতার প্রতি কোনো আগ্রহ জন্ম নিলে তা জন্ম নিয়েছিল কেবল স্œায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। জার্মান গোয়েন্দা বিভাগ সে দেশের কয়েকজন ব্রাদারহুড সদস্যকে সিরিয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করত। জার্মানি ও তাদের মিত্ররা ইস্টার্ন ব্লকের বাইরে সিরিয়া থেকে ইস্টার্ন ব্লকের দেশগুলোর ওপর নজরদারি করতে পারত। সর্বাধুনিক সোভিয়েত সমরাস্ত্র কেমন কাজ করছে, তারা তা পর্যবেক্ষণ করতে পারত। তাই জার্মান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সিরিয়া সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায় এবং এরই পথ ধরে জার্মানির মাটিতে সিরিয়ান বিরোধী দল সম্পর্কেও আগ্রহের সৃষ্টি হয়। পূর্ব-পশ্চিম সঙ্ঘাতে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিয়ে জার্মান কর্মকর্তাদের মনে যে ধরনের ভাবনা কাজ করে, ১৯৫০-এর শেষ দিক ও ১৯৬০-এর প্রথম দিকে আমেরিকানদের মাথায় কাজ করে একই ধরনের চিন্তাধারা। তাই সাংবাদিক আয়ন জনসন লিখেন, সাইদ রামাদান তার তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সম্ভবত সিআইএর কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন। আমেরিকানরা কমিউনিস্ট-বিরোধী রামাদান ও তার অনুসারীদের সহযোগিতাকে তৃতীয় বিশ্বে সোভিয়েত প্রভাব মোকাবেলার হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করত। তখনো তারা ভবিষ্যৎ আরব বিশ্বে ইসলামি আন্দোলনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেনি। তারা রামাদানকে খাটো করে দেখে এবং শেষ পর্যন্ত তার অনুসারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। তবে আরব দেশগুলোর ইসলামপন্থীদের উপস্থিতিকে জার্মান সরকার মেনে নিয়েছিল এর কোনো প্রমাণ নেই। কারণ তারা ওই সব দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। যেটা করা হয়েছে সেটা হলো, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির প্রতি আগ্রহী ছিল তাদের দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্য। প্রথম দিকে জার্মান কর্তৃপক্ষ মসজিদগুলোর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি চালালেও পরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১৯৬০-এর দশকে জার্মানিতে মুসলিম ব্রাদারহুডের উপস্থিতির ব্যাপারে দেশটির কর্তৃপক্ষের জ্ঞান ছিল ভাসা ভাসা। এরপরও তারা সংগঠনটি এবং এর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ব্যাপারে তেমন একটা মনোযোগ দেয়নি। কেবল ২০১১ সালে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এ সময় ইসলামি সংগঠনগুলোর সদস্য ও তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টি ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের মধ্যে আসে। ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করেছেন জার্মানির এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, ৯/১১-এর পরেই কেবল তারা সচেতন হয়েছেন। এর পর থেকে জার্মানির মুসলিম ব্রাদারহুডকে আর একপাশে ঠেলে দেয়া হয়নি। তাদের নিয়ে মিডিয়াতে লেখালেখির কারণেও রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্রাদারহুড সম্পর্কে আগ্রহ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, জার্মান ইসলামিক কনফারেন্সে, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ব্রাদারহুডকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে নেয়া হবে কি-না এ বিষয়ে বিতর্ক যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির মুসলমান ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা সম্পর্কিত বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করা। সম্মেলনে, জার্মানির সেন্ট্রাল কাউন্সিল অব মুসলিমের পাঁচটি অঙ্গসংগঠনের মধ্যে একটি ছিল ব্রাদারহুড এবং তারা সম্মেলনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সরকারের স্বীকৃতি লাভ করে। যদিও জার্মান সরকারের এই নীতি ছিল সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ এবং কেবল অভ্যন্তরীণ দৃশ্যপটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। তবে সেন্ট্রাল কাউন্সিলকে সরকার একটি অনিবার্য খেলোয়াড় মনে করে, যাকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যাপারে ‘প্রত্যাখ্যানের নীতি’ ২০১১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকে। ২০১০ সাল পর্যন্ত জার্মানি ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে সম্পর্ক আরব বিশ্বে মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যাপারে জার্মান নীতির কিছুটা প্রতিফলন ঘটে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিতে। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সেখানে সাধারণভাবে ইসলাম এবং বিশেষভাবে ব্রাদারহুড নিয়ে সরকারের কোনো ধারণা ছিল না। উপলব্ধির এই অভাব সেখানে ‘প্রত্যাখ্যানে’র মনোভাব সৃষ্টি করে। এমন নেতিবাচক মনোভাবের একটি কারণ, ব্রাদারহুড ছিল ‘অ্যান্টি-সেমিটিক’ ভাবাপন্ন। বিশেষ করে মিসরীয় ও ফিলিস্তিনি অনুসারীদের মধ্যে এই মনোভাব কাজ করত। ২০০১ সালের পর মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এর আন্তর্জাতিক পরিকাঠামোর গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। সেই সাথে সংগঠনটির সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে কি না তা নিয়ে বিতর্ক জোরদার হয়। নাইন-ইলেভেনের পর পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের একনায়ক শাসকদেরকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখতে পায়। ফলে মিসর, আলজেরিয়া, জর্ডান, সিরিয়া ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর সাথে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা জোরদার করে জার্মান সরকার। তখনো ব্রাদারহুডকে উপেক্ষা করার নীতি অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থী বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকাগুলোকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে থাকে জার্মান সরকার। জার্মানির মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিগত কয়েক দশকে জার্মানির মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয় : ইসরাইল-ফিলিস্তিনি সঙ্ঘাত, ইরানের সাথে সম্পর্ক এবং তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যের অংশ হিসেবে ধরা হলেÑ তুরস্কের সাথে সম্পর্ক। এই বৃহত্তর কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন সময়ে আরব দেশগুলো, বিশেষ করে মিসরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে জার্মানি। উপরিউক্ত সম্পর্কগুলোর যদি কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে থাকে তবে তা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতকে ঘিরে আবর্তিত হয় এবং সেখানে মিসরের ব্যাপারে (অথবা সাধারণভাবে আরব বিশ্বের ব্যাপারে) গভীর কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে জার্মানির কাছে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক তৈরির প্রশ্নটি তেমন প্রাসঙ্গিক ছিল না। ইসরাইলের টিকে থাকা এবং ব্রাদারহুডের ইসরাইলবিরোধী নীতি বিবেচনায় সহজেই অনুমান করা যায় জার্মান সরকার কেন তার কর্মকর্তাদের ব্রাদারহুডের সাথে নিচু পর্যায়ের সম্পর্ক সৃষ্টিরও অনুমতি দেয়নি। ১৯৯০-এর দশকে মিসরে দায়িত্ব পালনকারী একজন কূটনীতিকের বক্তব্য ছিল এ রকম : ১৯৯০-এর দশকে আমি যখন কায়রোর জার্মান দূতাবাসে কর্মরত, আমাকে ব্রাদারহুডের সাথে যোগাযোগের অনুমতি দেয়া হয়নি। সরকারিভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এটা যে করা যাবে না তা সবার কাছে পরিষ্কার ছিল। কূটনীতিক ও গোয়েন্দাদের কাজ ছিল আলাদা। কায়রো দূতাবাসে জার্মান বৈদেশিক গোয়েন্দা বিএনডির কেউ ব্রাদারহুডের সাথে কথা বলত না। কেবল ২০১১ সালে এসে সংগঠনটি সম্পর্কে ওই মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। ২০০১ সালের পর জার্মানি আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে নতুনত্ব আনে। চ্যান্সেলর গেরাহর্ড শ্রেয়েডার ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এই নতুন নীতি চালু করেন। এ সময় তিনি দু’বার উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করেন। তার উত্তরসূরি অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এবং তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যও একই পথ অনুসরণ করেন। প্রাথমিকভাবে এসব সফরের উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক হলেও এর সমান্তরালে আরব দেশগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যাপারে জার্মানির নতুন নীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিতে পরিবর্তনের দ্বারাও প্রভাবিত হয়। জার্মানি সর্বদা ইউরোপিয়ান কমন সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন পলিসির (সিএসএফপি) ঘোর সমর্থক। তাই জার্মান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণের জন্য এর ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট অনুধাবন সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ মূলত পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয়তাকে পছন্দসই ধারণা হিসেবে বেছে নেয় জার্মানি। ১৯৪৯ সালের পর দেশটির কাছে বহুপক্ষীয়তার অর্থ ছিল সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়া। অন্য দিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে এর অর্থ ছিল সার্বভৌম ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। এমনকি ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি একত্রীকরণ এবং ১৯৯২ সালে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার পরও জার্মানি তার আগের দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল থাকে। যদিও চ্যান্সেলর শ্রয়েডার ইঙ্গিত দেন যে, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় অধিকতর সক্রিয় অংশীদারের ভূমিকা পালন করবে জার্মানি। ওই বছরগুলোতে উত্তর আফ্রিকার ব্যাপারে জার্মানির আগ্রহ তীব্রতর হয়। ১৯৯০ দশক পর্যন্ত একটি অপ্রকাশ্য শ্রমিকবিনিময় চুক্তি কার্যকর ছিল। যাতে স্পেন ও ইতালির সাথে মিলে ফ্রান্স ভূমধ্যসাগরের উত্তরভাগের দেশগুলোর সাথে ইইউর সম্পর্কে নেতৃত্ব দেয়। একই সময়ে জার্মানির মনোযোগ ছিল পূর্ব ইউরোপে ইইউর সম্প্রসারণের দিকে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাপারে জার্মানির আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এটা হয়েছিল মূলত ১৯৯৫ সালে শেনজেন চুক্তি এবং ১৯৯৯ সালে কার্যকর হওয়া আমস্ট্রার্ডাম চুক্তির কারণে। এসব চুক্তির ফলে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃইউরোপীয় সীমান্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়। সব সীমান্ত উন্মুক্ত না হলেও জার্মানি, ইতালি ও স্পেন চুক্তি পক্ষ হওয়ায় জার্মান সীমান্ত কার্যত ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তাই এবং যেহেতু উত্তর আফ্রিকা থেকে অভিবাসন জার্মানির জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল, তাই দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার ব্যাপারে নিজস্ব স্বার্থ এবং দৃষ্টিভঙ্গি সুনির্দিষ্ট করতে বাধ্য হয় বার্লিন এবং ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে। এই নীতিতে নিরাপত্তার দিকগুলো সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর জিহাদি সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবেলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই হুমকির সৃষ্টি আরব বিশ্ব থেকে, এমন একটি মনোভাব ছিল জার্মান নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। যার ফলে ২০০১ সালের পর বার্লিন সরকারের নীতি ছিল মূলত ওই অঞ্চলে সহিংসতা সামাল দেয়াকে ঘিরে। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর ইউরোপে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বেড়ে গেলে তা জরুরি হয়ে পড়ে। ২০০৭ সাল থেকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা এজেন্সিগুলো আশঙ্কা করতে থাকে যে, উত্তর আফ্রিকান দেশগুলো থেকে সন্ত্রাসবাদ ইউরোপে বিস্তৃত হতে পারে। তাই সার্বিক বিবেচনায় জার্মান সরকার সন্ত্রাসী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আরব সরকারগুলোকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা রক্ষাÑ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে জার্মানির সম্পর্কের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। জার্মান সরকার অনেক আরব দেশের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে। জার্মান নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, বিশেষ করে ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (বিএনডি) বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অভাব থাকায় এই সহযোগিতা জোরদার করা হয়। দশকের পর দশক এই সংস্থাটি কেবল সেভিয়েত ইউনিয়ন ও ওয়ারশো চুক্তির দিকে মনোযোগ দিয়ে আসছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভাষাভাষীদের ব্যাপারে এর দক্ষতায় ঘাটতি ছিল ব্যাপক। তাই যেসব দেশ থেকে আল কায়েদার সদস্যরা এসেছে সেসব দেশের সাথে সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয় সংস্থাটি। মিসর, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, জর্ডান, কুয়েত ও সিরিয়ার সাথে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা জোরদার করে। কিছু কিছু জার্মান পর্যবেক্ষক অবশ্য এই সহযোগিতার ঘোরবিরোধী। কারণ পশ্চিমাদের এই সহযোগিতা স্বৈরাচারী সরকারগুলো কেবল আল কায়েদা ধরনের শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা করছে না; ওই সব সরকার অন্যান্য ইসলামপন্থী বিরোধী দলকে দমন এবং ক্ষমতা সুসংহত করার কাজেও তা ব্যবহার করছে। জার্মান সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য নীতির লক্ষ্য হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রায়নকে ঘোষণা করলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যাই হোক, লক্ষ্যের সঙ্ঘাত নিয়ে জার্মানিতে কখনোই নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিতর্ক হয়নি। এটা স্পষ্ট হয় ২০০৭-০৮ সালের শীতকালে বিএনডির কর্মকাণ্ড তদন্তে নিয়োজিত একটি কমিশন যখন জার্মান সরকার ও সিরিয়ার মধ্যে ২০০২ সালের একটি সহযোগিতা পর্যালোচনা করে। এতে জার্মান সরকার জিহাদি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য লাভের আশা করলেও সিরিয়ার আগ্রহ ছিল জার্মানিতে আশ্রয় নেয়া সিরিয়ান ভিন্ন মতাবলম্বী, বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর নজরদারির ব্যাপারে। অবশ্য সহযোগিতা তেমন ফলোদয় হচ্ছে না দেখে বিএনডি বেশি দিন তা অব্যাহত রাখেনি। সমালোচকদের মতে, জার্মান সরকার এমন এক রাষ্ট্রকে সহাযোগিতা করেছে, যেখানে বন্দীদের ওপর নিত্য নির্যাতন চালানো হয়। এ ছাড়া অন্য আরব দেশের সাথে সহযোগিতার বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসেনি। নাইন-ইলেভেন-উত্তর সময়ে জার্মানিতে কিছু আমলাতান্ত্রিক পরিবর্তন আসে, যা দেশটির মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং পরোক্ষভাবে ব্রাদারহুড সম্পর্কিত নীতিকে প্রভাবিত করে। এই অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদের হুমকি যেহেতু ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয় জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বস্তুত জার্মান সরকার ওই অঞ্চলের অংশীদারদের সাথে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা চালায় অনেকটা অভ্যন্তরীণ স্বরাষ্ট্রনীতি এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধ প্রচেষ্টার সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সহযোগিতার ব্যাপারে কেবল ওই সব দেশের প্রতি মনোযোগ দেয়া হয় যেখান থেকে জার্মানির প্রতি হুমকি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। তবে পররাষ্ট্্রনীতি চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল এই নীতি। ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় পশ্চিমাপন্থী সরকারগুলো। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল উত্তর আফ্রিকা, প্রধানত আলজেরিয়া। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মরক্কো ও মিসরকেও সহযোগিতা দেয়া হয়। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আল কায়েদার সন্ত্রাসীরা ইউরোপে হামলা চালাতে পারে, এমন আশঙ্কা কাজ করে ওই নীতির পেছনে। অধিকন্তু, জর্ডান ও কুয়েতের সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করে জার্মান সরকার। এ ছাড়াও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরব, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং অন্যান্য দেশের সাথে কাজ করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট আগ্রহ ব্যক্ত করে। ২০১১ ও পরবর্তী সময়ে জার্মানি ও মুসলিম ব্রাদারহুড নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী মনোভাবের আধিপত্য ২০১১ সালের আগে জার্মান সরকারকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে দেয়নি। এমনকি ২০০১ সালের পরও যখন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রত্যাখ্যানের নীতিতে অটল থাকে, তখন আরব ও মুসলিম বিশ্বের ঘটনাবলি সম্পর্কে আরো বেশি করে জানার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন দেশটির অনেক কূটনীতিক। যার ফলে ২০০২ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘মুসলিম বিশ্বের সাথে আলোচনা’ শীর্ষক একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। এর প্রধান হিসেবে একজন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হয় এবং বার্লিনে ছোট পরিসরে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। তাদের জন্য বিভিন্ন দূতাবাসে পদ সৃষ্টি করা হয়। এই বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিনিধি এবং মুসলিম বিশ্বের আরো অনেকের সাথে সরকারি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা সরকারি নীতি না হলেও তা আরব বসন্তের পর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্ঞান বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। এই কর্মসূচির সাথে সংশ্লিষ্ট একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন : এসব ব্যক্তিকে যেসব কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়, তা অন্যরা করতে পারত না। এর লক্ষ্য ছিল আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এই কর্মসূচির কিছু সমালোচনা থাকলেও তা ২০১১ সালের পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলির ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে জার্মানিকে সহায়তা করে। ফলে কেবল মুসলমানদের সাথেই নয়, ইসলামপন্থী রাজনীতিকদের সাথেও প্রথম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র দফতরকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও পালার্মেন্ট সদস্যরা ইউরোপীয় সরকার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যদের নিয়ে বেশ কিছু বহুপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেয়। এমন আস্থাসৃষ্টিকারী পদক্ষেপগুলো ২০১১ সাল-পরবর্তী সময়ে নতুন জার্মান নীতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০১৩

ফিলিস্তিনের নন্দিত রাজনীতিক মেশালকে হত্যায় মোসাদের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান






ফিলিস্তিনের মুকুটহীন সম্রাট, নন্দিত রাজনীতিক ও গাজা শাসনকারী হামাসের প্রধান খালেদ মেশালকে হত্যায় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের কাহিনী ফাঁস হয়ে গেছে।
আজীবন দেশান্তরিত এই স্বাধীনতা সংগ্রামীকে অভূতপূূর্ব পৈশাচিকতায় হত্যা করতে চেয়েছিল ইহুদিবাদী ইসরাইল। তবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি। ইসলামপন্থী এই রাজনীতিককেই সম্ভবত ইসরাইল নামক হায়েনা রাষ্ট্রটি সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। মেশালকে হত্যা পরিকল্পনার কাহিনী নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তথ্যচিত্রটি তৈরি করেছেন পরিচালক ইয়াসের আবু হিলালাহ। ১৯৯৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি বর্বর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মেশালকে হত্যার চেষ্টা করে। তখন থেকে তিনি জর্ডানে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তাকে হত্যার জন্য আম্মানে উপস্থিত হয় ছয় সদস্যের মোসাদ টিম। ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে আমস্টারডাম, টরোন্টো ও প্যারিস থেকে একযোগে জর্ডানের রানী আলিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে আম্মান প্রবেশ করেন তারা। এ প্রসঙ্গে ‘কিল হিম সাইলেন্টলি’ তথ্যচিত্রের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে মেশাল বলেন, ‘ওই বছর গ্রীষ্মেই ইসরাইলি হুমকি শুরু হয়। ফিলিস্তিনি অভিযান বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় ইসরাইল। কাজেই তারা নির্বাসিত হামাস নেতাদের হুমকি দিতে লাগল। এসব হামলার নেপথ্যেই লুকিয়ে ছিল ইসরাইলি পরিকল্পনা। তবে ইসরাইল যেহেতু কোনোদিনই জর্ডানে কোনো অভিযান চালায়নি, তাই আমরা অনেকটা নির্ভার ছিলাম।’ জেরুজালেম ও তেলআবিবে হামাসের সিরিজ আত্মঘাতী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মোসাদ মেশালকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এসব হামলায় অন্তত ২০ ইসরাইলি নিহত ও শ’ শ’ লোক আহত হয়। এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ইসরাইল। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু মোসাদসহ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। তিনি হামাসের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল চরম প্রতিশোধ নেয়া। সে সময় জর্ডান ও ইসরাইলের সম্পর্কও ভালো যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় গোপন অভিযান চালিয়ে মেশালকে হত্যার সবুজ সঙ্কেত দেন নেতানিয়াহু। সিদ্ধান্ত হয়, মেশালকে এমন বিষ প্রয়োগ করা হবে, যাতে ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্ক অচল হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। পরিকল্পনা করা হয়, মেশালের কানে বিষ ছিটিয়ে দেয়া হবে। এতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হবে। ফলে কোনো অস্ত্র ছাড়াই মেশালকে হত্যা করা সম্ভব হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেশালের কানে বিষ প্রয়োগ করে দু’জন মোসাদ এজেন্ট। তবে তাদের ধাওয়া করেন মেশালের একজন দেহরক্ষী মুহাম্মদ আবু সাইফ। পরে প্যালেস্টাইন লিবারেশন আর্মির একজন কর্মকর্তার সহায়তায় এজেন্টদের ধরে ফেলা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের একটি চরম ব্যর্থ বিশেষ অভিযান। এরপরই বিস্ময়কর উত্থান ঘটে হামাসের। দুই পর্বের এই তথ্যচিত্রে খালেদ মেশালের পাশাপাশি তত্কালীন মোসাদের প্রধান ড্যানি ইয়াটমের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়েছে। ড্যানিই এই পরিকল্পনার প্রধান হোতা ছিলেন। কিন্তু মোসাদ এজেন্টরা ধরা পড়ার পর মেশালকে বাঁচাতে প্রতিষেধক নিয়ে আম্মানে উপস্থিত হন ড্যানি। তথ্যচিত্রের দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হবে মেশালকে হত্যার পর পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান ও ইসরাইলের মধ্যকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নাটকীয় ঘটনাবলী। জর্ডানের রাজার অফিসের কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আলী শুকরি সে সময় পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি বলেন, ‘জর্ডানের রাজা হুসেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে ফোন করে ঘটনা অবহিত করেন। এ ঘটনা শুনে বিস্মিত হন ক্লিনটন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, জর্ডানে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আলাপচারিতা শেষে ক্লিনটন নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ওই লোকটা অসম্ভব মানুষ।’ ক্লিনটনকে রাজা বলেন, ‘মেশালকে বাঁচাতে প্রতিষেধক ইসরাইলকেই দিতে হবে। মেশাল মারা গেলে ইসরাইল-জর্ডান শান্তিচুক্তি বাতিল করা হবে।’ এ সময় ইসরাইল থেকে প্রতিষেধক নিয়ে আম্মানে হাজির হন মোসাদ প্রধান ড্যানি। রাজা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। দু’দেশের মধ্যে এ সময় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। রাজা আম্মানের ইসরাইলি দূতাবাস ঘেরাও করে রাখার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেন। মোসাদের ডেথ স্কয়াডের সদস্যরা দূতাবাসে পালিয়েছিল। এ সময় মেশালকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন হুসেন মেডিকেল সিটি হাসপাতালের চিকিত্করা। মেশাল সে সময় কোমায় চলে যান। বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, মেশালকে মরফিন জাতীয় মাদক প্রয়োগ করে মোসাদ, যার ফলে দেহ অসাড় হয়ে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে। ২৭ সেপ্টেম্বর মেশাল মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থা কোমা থেকে ফিরে আসেন। এতদিন এই শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী অনেকেরই ছিল অজানা। বিশেষ করে গণমাধ্যম অতিসম্প্রতি এ সম্পর্কে জানতে পেরেছে।
আল জাজিরা অবলম্বনে ইলিয়াস হোসেন