মঙ্গলবার, ৫ জুন, ২০১২

পারমাণবিক অস্ত্র ও ইরান



ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যঞ্জক পরিস্থিতিতে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। চার সপ্তাহ আগে ইস্তাম্বুলে ইরানের সাথে ৫+১ গ্রুপের (জাতিসঙ্ঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি) আলোচনা শুরু করার জন্য কি ওয়াশিংটন আহ্বান জানিয়েছিল? ওই আলোচনা বৈঠকটি হচ্ছে ইতিবাচক প্রথম পদক্ষেপ। ইসরাইল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আগাম হামলা চালাবে বলে কয়েক মাস ধরে জল্পনা-কল্পনার পর এখন কূটনৈতিক সমাধানের একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এখন সবার মনোযোগ বাগদাদের দিকে নিবদ্ধ। কারণ সেখানে ২৩ মে দ্রুত একটি চুক্তি স্বাক্ষর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার টেবিলে ইরানের আরো অধিক গঠনমূলকভাবে ফিরে আসাটা হচ্ছেÑ স্পষ্টত একটি শাণিত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। ইরানের মুখ্য আলোচক সাঈদ জালালি আলোচনার পূর্বশর্ত আরোপ করায় অন্যান্য দেশ তা মেনে নেয়নি এবং এর ফলে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে সর্বশেষ দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়। কিন্তু ২০১১ সালের শেষ থেকে এ পর্যন্ত তেহরান সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। জাতিসঙ্ঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে তাদের উদ্বেগ জানিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ওয়ার্ল্ড অব হার্ট বা ক্ষতিকর বিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্দিন বা কষ্টকর অবস্থা নিয়ে এসেছে। আমেরিকা এখন ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ব্যবসায় পরিচালনাকারী যেকোনো বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আগামী জুলাই মাসে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা। ইরাক আগ্রাসনের কিছু দিন পর ২০০৩ সালে সর্বশেষ, ইরান মনে হয় সহযোগিতা করতে আগ্রহী হলো। জর্জ বুশ ইরানকে শয়তানের অক্ষশক্তি নামে আখ্যায়িত করেছিলেন (অপর দুই দেশ হলো ইরাক ও উত্তর কোরিয়া)। ইরানও ইরাকের ভাগ্যবরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করে ইরান পরমাণু বিস্তার রোধ চুক্তি তথা এডিশনাল প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির কারণে আইএইএ পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশের অধিকার আরো বেড়েছে। দু’বছর পরে ইরাকে যখন আমেরিকার অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না, তখন ইরান তাদের দেশে আগ্রাসনের আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে মনে করেছিল। সেই সাথে, তার প্রতিজ্ঞা থেকে সরে এসেছে। 
কিন্তু চাপের কারণে যে প্রতিক্রিয়া হয়, তাতে কখনো যথাযথ ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন ঘটে না। সঠিক ইচ্ছার মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা যায়। পুনরায় শুরু হওয়া আলোচনা ইরানকে একটি নতুন পাঠ গ্রহণের ব্যাপারে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবে এবং মারাত্মক বিপজ্জনক সঙ্কটকে শান্ত করতে পারবে। কিন্তু সন্দেহবাদীরা মনে করে, ‘ইরান সরকার সময় কাটানোর জন্য খেলছে। তারা একটি ুদ্র পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সর্বনাশ বা বিপর্যয় যা হওয়ার হয়ে গেছে। ইরানকে থামিয়ে দেয়ার ব্যাপারে খুব বেশি দেরি হয়ে গেছে। ইরান ইতোমধ্যে পরমাণু শক্তি অর্জনের এত দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে যে, এখন অবশ্যই প্রধান প্রচেষ্টা হওয়া উচিত সৌদি আরব ও মিসরের মতো প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী পরমাণু শক্তিগুলোকে একইপথ অবলম্বন করা থেকে বিরত রাখা।’
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর একটি হচ্ছে ইরান ইউ-২৩৫-এর ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। এটাকে দ্রুত উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে (এইইইউ) রূপান্তরিত করা যায়। এই অস্ত্র গ্রেড হচ্ছে সাধারণত ৮৫ শতাংশ অথবা ইউ-২৩৫-এর বেশি। কিন্তু সেখান থেকে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ পেতে তুলনামূলকভাবে কম সময় লাগবে। দ্বিতীয়ত, ইরান তার গ্যাস সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা কাজে লাগিয়ে তার মজুদ করা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিম্নসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে (এলইইউ) ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে পারে। তৃতীয়ত, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে সংযুক্ত করার জন্য ইরান ুদ্র ও হালকা পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সবদিক বিবেচনা করলে বলা যায়, ইরান এখন পরমাণু অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। ইরানের ইতোমধ্যে প্রায় এলইইউ-এর ৩ দশমিক ৫ শতাংশের প্রায় ৬০০০ কেজি রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় পাঁচটি বোমা সহজেই উৎপাদন করা যায়। এই বোমাগুলো ওয়েপন্স গ্রেড এইইইউ মূল্যায়নের সমান। পবিত্র কোম শহরের কাছে নতুন ফরদো সমৃদ্ধকরণ স্থানে চারটি সেন্ট্রিফিউজ কেসকেইড ব্যবহার করে এবং প্রধান নাতানজ পরমাণু স্থাপনায় আরো ১৫টি অতিরিক্ত ক্যাসকেইড ব্যবহার করে (প্রত্যেকটিতে ১৬৪ থেকে ১৭৪ সেন্টিফিউজ রয়েছে)। সম্প্রতি ১৯.৭৫ শতাংশ এলইইউ-এর তিন গুণ উৎপাদনের মাধ্যমে এক মাসে প্রায় ১৩ কেজি উৎপাদিত হচ্ছে। এর এখন ১৫০ কেজি মজুদ থাকতে পারে, এমনকি ১৮৫ কেজির কাছাকাছি থাকাও সম্ভব। মাঝারি পর্যায়ের অত্যাধুনিক অন্তস্ফোটন ডিভাইস তৈরি করার জন্য ৮৫ কেজি মজুদ প্রয়োজন। অবশ্য প্রথম বোমা তৈরির জন্য প্রাথমিক ওয়াচ স্টেজের কারণে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ এলইইউ-এর দ্বিগুণ উপাদান প্রয়োজন হবে।
আইএইএ’র নভেম্বরের রিপোর্টে আভাস দেয়া হয় যে, ইরান সম্ভবত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক অস্ত্র সজ্জিত করে ব্যবহার করার জন্য ইতোমধ্যে একটি অত্যাধুনিক ডেটোনেশন সিস্টেম পরীক্ষা করেছে। ২০০৪ সালের আগে সম্ভবত ওই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। আইএইএর দেয়া তথ্য মতে, কর্ম এবং গোয়েন্দা সূত্র ধারণ করেছে পরমাণু অস্ত্রের ব্যাপারে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হচ্ছেÑ দেশটি এনপিটি ত্যাগ করলে এবং তাদের সব কর্মসূচি পরিত্যাগ করলে একক ক্রুড ডিভাইস তৈরির জন্য কয়েক মাস এবং তিন অথবা চারটি পরমাণবিক অস্ত্রের কারখানা এবং সলিড ফুয়েলড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য দুই বছরের বেশি সময় লাগবে। লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) পারমাণবিক বিস্তাররোধ বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিটজ প্যাট্রিক এবং ওয়াশিংটন ভিত্তিক নন প্রোলিগারেশন পলিসি এডুকেশন সেন্টারের (এনপিইসি) গ্রেগ জোনস ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির টাইম স্কেলের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। জোনস মনে করেন, ইরান অধিকতর দ্রুততার সাথে একটি পরমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে। কিন্তু উভয়ে একমত হন যে, ইরান ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু সংগ্রহ করেছে। এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু রাজনৈতিক সবুজ সঙ্কেত প্রয়োজন। ওবামার কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। সাধারণত আমেরিকার নীতি হচ্ছেÑ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সামর্থ্য অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোতে ইরানকে কেবল পরমাণু অস্ত্র পেতে তথা পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে বলেছেন, ইসরাইল সরকার ও হোয়াইট হাউজের মধ্যে ওটা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ইসরাইল সরকার এখনো চাপ দিচ্ছে যে, তাদের রেড লাইন হচ্ছে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হওয়া। মি. ফিটজপ্যাট্রিক পরামর্শ দেন যে, ইসরাইলকে একটি নতুন রেড লাইন ‘অনাক্রমণ বা নিরাপত্তা অঞ্চল’-সংক্রান্ত ধারণার ঘোষণা দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইহুদ বারাক গত বছর ওই বিষয়টির উল্লেখ করতে শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে ইসরাইলের একাকী তৎপরতা চালানোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। ইসরাইল একাকী কাজ করলে একটি সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতিকে অন্তত বন্ধ করে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারবে। ইহুদ বারাক উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ফোরদোতে দ্রুত সেন্ট্রিফিউজের ক্যাসকেইড স্থাপনের মাধ্যমে ইরান চলতি বছর ওই পর্যায়ে চলে যাবে। ফোরদে পরমাণু স্থাপনাটি পাহাড়ের ৮০ মিটার নিচে নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে গতানুগতিক বোমা হামলার মাধ্যমে কোনো ক্ষতি করা যাবে না। ইহুদ বারাকের ইমিউনিটি থিওরির ব্যাপারে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল বেনি গানটজ সম্মত নন। 
তিনি হচ্ছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসরাইলি পত্রিকা হারেজ-এর সাথে গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল গান্টজ তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করে বলেন, সুস্পষ্টভাবে ইরানের যতই অগ্রগতি হবে পরিস্থিতি ততই খারাপ হবে। এটা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর। তিনি বলেন, আমরা এমন একটা সময়ে আছি, যখন কিছু একটা অবশ্যই ঘটবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রোমনি এবং কংগ্রেসের অনেক সদস্যের হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, ওবামা হয়তো আরেকটি রেড লাইনে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে হয়তো এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যাতে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখতে পারবে। প্রকাশ্যে কিছু বলা হচ্ছে না, কিন্তু বুশ প্রশাসনের নতুন চিন্তা হচ্ছেÑ ইরানের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা। এই চুক্তির মাধ্যমে কিছু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়া হবে। ইরান দাবি করে আসছে, এনপিপির শর্তাধীনে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার আছে। ফিটজ, প্যাট্রিক সতর্ক করে দেন যে, এটাকে একটা প্রস্তাবের অংশের চেয়ে একটি সফল আলোচনায় ধারণাগত শেষ পয়েন্ট হিসেবে দেখা উচিত। এনপিইসির ডাইরেক্টর হেনরি সোকোলস্কি মনে করেন, এ ধরনের চুক্তি কোনো কাজে আসবে না। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার অনুমতি দিলে দেশটির পরমাণু সক্ষমতা বজায় থাকবে এবং যেসব দেশ পরমাণু ক্ষমতা অর্জনে প্রত্যাশী, তাদের জন্য একটি বিপজ্জনক উদাহরণ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই তাকে থামানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ইরানকেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে যে, পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে তাকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। আইএইএ-তে ইরানি দূত আলী আসগর সুলতানি বলেছেন, ইরান কখনো তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না। ফোরদো হচ্ছে একটি নিরাপদ এলাকা। সেটাকে বন্ধ করে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই।
ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি গত ফেব্রুয়ারি মাসে বলেছেন, পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী বা মালিক হওয়া একটি মারাত্মক পাপ। এই বক্তব্যের মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্রের ব্যাপারে তার নমনীয় ভাব প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের সত্যিই পরমাণু অস্ত্র অর্জনের কোনো ইচ্ছা না থাকলে দেশটির সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ আছে। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা না হলে, ইরানকে নিশ্চিতভাবে আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞার মোকাবেলা করতে হবে এবং সামরিক হামলার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাবে। 
দি ইকোনমিস্ট থেকে (সংক্ষেপিত)
ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

মোবারক, আসাদ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সমর্থিত একনায়ক: ফিস্ক


রবার্ট ফিস্ক
রবার্ট ফিস্ক

ফিস্ক



ভুল জায়গায়, ভুল সময়ে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতা করার চেয়ে খারাপ কাজ আর কিছু নেই। কায়রোতে হোসনি মোবারকের বিচারকাজ কভার করা প্রসঙ্গে এমন কথাই বলেছেন রবার্ট ফিস্ক। লেবানন থেকে কায়রোতে গিয়েছেন তিনি। আর সেখান থেকেই মিসর, সিরিয়া ও লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন আরেকটি প্রতিবেদন। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেই প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি ভাষান্তর দেওয়া হলো এখানে:

‘এক সপ্তাহ আগে সিরিয়ার হাওলায় যখন গণহত্যা চলছিল, তখন টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বলেছিলেন, তাঁর সেনাবাহিনী এই হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী নয়। সিরিয়ার যেকোনো হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এই একই রকম বক্তব্য দেন আসাদ। এদিকে মিসরে নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন আহমেদ শফিক। আর তাঁর মধ্যে আমি দেখতে পাই হোসনি মোবারকের ছায়া। হোসনি মোবারককে মিসরের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা সমর্থন করেন। আহমেদ শফিককেও সমর্থন করেছেন তাঁরাই। আর আসাদকেও সিরিয়ার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা সমর্থন করেন। তাই মোবারক বা আসাদ সবাই হলেন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সমর্থিত একনায়ক। অর্থাত্ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করেন। এর চেয়ে আর বেশি কিছু বলার দরকার আছে?
গত শনিবার মিসরের একনায়ক হোসনি মোবারককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর গত রোববার সিরিয়ার একনায়ক বাশার আল আসাদ বলেছেন, তিনি রয়েছেন হুমকির মুখে। তাঁর দেশের যুদ্ধ বিশ্বের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। আসাদের এই আশঙ্কা বা হুমকির মানে আমরা বুঝি। সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে লেবাননের ত্রিপোলির ভবিষ্যত্ এখন সন্দেহের বেড়াজালে বন্দী। বেশি দিন আগের কথা নয়। লেবাননের এক বন্ধু আমাকে বলেন, আসাদ যদি বিপদে পড়েন, তাহলে তিনি লেবাননের ভবিষ্যত্ বা অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতিতে বোঝা যায়, লেবানের ওই বন্ধুটি কেন এ রকম কথা বলেছিলেন। সিরিয়া আর লেবাননের মধ্যে সম্পর্ক কতটা গভীর।
আরব-বসন্তের জন্য এটা একটা খারাপ সময়। ইয়েমেনেও চলছে এখন অস্থির সময়। যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে একের পর এক চালকবিহীন বিমান হামলা (ড্রোন) চালাচ্ছে। আর সে কাজে মার্কিনিদের সমর্থন জোগাচ্ছে ইয়েমেনের সরকার। মিসরে অনেক মার্কিনি রয়েছেন, যাঁরা আহমেদ শফিককে সমর্থন দিচ্ছেন। মিসরের আল হারেম পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, শফিকের শাসন হোসনি মোবারকের শাসনের চেয়ে খুব বেশি আলাদা হবে না। শফিকের শাসনামলেও মিসর পরিণত হবে পুলিশি রাষ্ট্রে। শফিকের বিজয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে গেছে মিসরের বিপ্লবের স্বপ্ন। পত্রিকাটিতে আরও বলা হয়, যাঁরা মিসরে বিপ্লব আনতে চেয়েছিলেন, সে জন্য যাঁরা অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের সেই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব আসবে না, যত দিন পর্যন্ত মিসরের প্রচলিত প্রথাগুলো না বদলাবে। মোবারকের শাসনামলে মিসরের কোনো পত্রিকায় এ রকম কোনো লেখা প্রকাশ হওয়ার কথা ভাবাও যায় না। এ রকম কোনো প্রতিবেদন কি লেবাননে পাওয়া সম্ভব? লেবানন বা ইয়েমেন কি তাদের স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন নয়? এটা স্পষ্ট যে বদল খুব বেশি হোক বা না হোক, আরব জেগে উঠছে। আরবে বসন্ত আসছে। আর আমি মনে করি, সিরিয়াও জেগে উঠছে।
সম্প্রতি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বলেছেন, তাঁর দেশের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মনে রাখতে হবে, সিরিয়ায় যুদ্ধ পাশের দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে লেবানন। রবার্ট ফিস্ক বলেন, আমি লেবানন ও লেবাননের যারা বাশার আল আসাদকে সমর্থন করছেন, তাঁদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। মিসরে শফিকের জয়ের সম্ভাবনা এবং ওয়াশিংটনে যাঁরা শফিককে সমর্থন করেন, তাঁদের নিয়েও আমি উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে শফিকের সমর্থকেরা চাইবেন মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে আবার নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করুক। মোবারকের পুরোনো আমল আবার হয়তো নতুন করে ফিরে আসবে। রিপাবলিকানরাও মোবারকের শেষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের ভালোবাসা দেখাবে। তবে এ ক্ষেত্রে মিসরের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসি হতে পারেন আশার আলো। তবে এ জন্য তাঁকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। দেখাতে হবে যে ইসলামপন্থী সরকার মিসরের অর্থনীতিকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারে—দুর্নীতি দমন করতে পারে। যেমনটা ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার ইসলামপন্থী সরকার করেছিল। 
এবার দেখা যাক সিরিয়ার সীমান্তবর্তী লেবাননকে। সীমান্তবর্তী দেশ লেবানন অনেকটাই স্বাধীন। তাদের গণমাধ্যমও স্বাধীন। লেবাননকে দেখে সিরিয়া স্বাধীনতার শিক্ষা নিতে পারে। কিন্তু সিরিয়ার দুর্ভাগ্য। শুধু স্বাধীনতার অভাবই নয়, দেশটি হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ থেকেই বের হতে পারছে না। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এ জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেছেন। তিনি সঠিক হতেও পারেন। এটা ঠিক যে লেবানন দিয়ে পাচার হয়েই বাইরে থেকে অস্ত্র ঢোকে সিরিয়ায়।
আর এসব পরিস্থিতিতে মিসরে অশুভ সংকেত দেখতে পাই আমি। শফিক জিততে পারেন, মোবারকের বিচার হতে পারে, আসাদেরও পতন হতে পারে কিন্তু আমি ভয় পাই গৃহযুদ্ধকে। তবে সবকিছুর মধ্যেও টিকে থাকবে লেবানন।

রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

গালফ ইউনিয়ন গঠনের পরিকল্পনা প্রস্তাব




মুহাম্মদ এনামুল হক :
 গত ১৪ই মে, সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত খাদেমুল হারামাইন আশ শারীফাইন বাদশাহ আব্দুল্লাহ-এর সভাপতিত্বে গালফ দেশগুলোর এক সম্মেলনে মুসলিম বিশ্ব তথা ইসলামী উম্মাহর সুবিধা অসুবিধা পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ব্যাপক লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)-এর আদলে পারসিয়ান গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (পিজিসিসির) অথবা ফেডারেল রাষ্ট্র গালফ ইউনিয়ন গঠনের পরিকল্পনা প্রস্তাব আবারো প্রমাণ করলো সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ বিশ্ব শান্তি বাস্তবায়নে বিশেষ প্রয়াসী।
ইতিমধ্যে এ পরিকল্পনার একটি খসড়া প্রস্তাব (পিজিসিসির) সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে হস্তান্তর করেছেন খোদ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স সাউদ আল ফয়সল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জোট গঠন একদিকে যেমন রক্ষাপ্রাচীর হিসাবে কাজ করবে, পাশাপাশি আরব বিশ্বে তথা উত্তর আফ্রিকা-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। মুসলিম বিশ্বের যথাযথ স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিধানে ঐক্যশক্তি হিসাবে অবদান রাখবে। অনেক দেরিতে হলেও বাদশা আব্দুল্লাহর জোট গঠনের এই প্রস্তাব সারা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো বিশেষ করে পিজিসিসির দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক অভিনন্দিত হবে এবং যত শিগগির এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে ততই মঙ্গল হবে।
বর্তমান বিশ্বে কয়েকটি জোটই বিভিন্ন শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। হউক তাদের ঐক্যমতে অথবা দ্বিমতে। কারণ, বিশ্বের কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে সাথে নিন্দা অথবা সমর্থন যাই জানানো হয়ে থাকে, ঐ ঘটনার ব্যাপকতা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলতে থাকে। তারমধ্যে জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইইউ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে, এগুলো সব সময়ই মুসলিম বিশ্বের স্বার্থের প্রতিকূলেই হয়ে থাকে। তাই, বিশ্বের মুসলমানদের অনুকূলে একটি সহায়ক জোট শক্তির বড়ই প্রয়োজন ছিল। বর্তমান জোটের রূপরেখা হতে পারে ন্যাটোর আদলে অথবা (ইইউ)-এর আদলে। তাতে বিশ্বে শান্তি স্থিতিশীলতা আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেই আশা করা যায়। তবে মুসলিম বিশ্বের জোট যেন ওআইসি-এর আদলে না হয়। কারণ, বাদশাহ্ আব্দুল্লাহ যেভাবে বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে আন্তঃধর্মীয় ডায়ালগ একের পর এক বিশ্বে শান্তির সুবাতাস বহায়েছে এবং বিশ্বে মুসলিম বিশ্বের মধ্যমণি সৌদি আরবের বাদশাহ-এর নেতৃত্বকে বিশ্ব শান্তি আনয়নের সহায়ক ভূমিকা পালনে অনুকূল ধারণা জন্মিয়েছে, তারই এক ছোট বাস্তবতা হয়তো এই জোট গঠন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই জোট গঠন বাস্তবে রাজনৈতিক ঐক্য, সামাজিক ঐকমত্যের ঐক্য পারস্পরিক সহযোগিতার ঐক্য হবে। তাহলে পরে জোট একটি বাস্তবিক শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে।
এ জোটের আওতাভুক্ত দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদই সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। রাষ্ট্রগুলোর জনসংখ্যা কম হলেও মাথাপিছু আয়ের অনুপাতে, ইইউর দেশগুলোর সদস্যদের চাইতে অনেকাংশে ভাল অবস্থানে আছে। যেই দেশগুলো নিয়ে জোট গঠনের পরিকল্পনা খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে স্ব স্ব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে সেই দেশগুলো হলো-সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। এই ছয়টি দেশ। ইতিমধ্যে সদস্য দেশগুলোর কর্ণধারদের পক্ষ থেকে পরিকল্পনার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণা করেছে এবং এর জন্য সার্বিক সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে।
বাদশাহ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই পরিকল্পনা সম্মেলনে একটি ঐতিহাসিক পরিকল্পনার সূত্রপাত করেছে যা মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ সংরক্ষণে যুগ যুগ ধরে অবদান রাখবে। পরিকল্পিত জোটটি সম্পূর্ণ গণতন্ত্রের আদলে পরিচালিত হবে। যা ভবিষ্যতে বাদশাহ আব্দুল্লাহর ভূমিকার মত আরো ব্যাপক ভূমিকা পালনে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। এই মহতি উদ্যোগ পরিকল্পনা যা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশস্থ জোট বিরোধী মতবাদে মূলত বিশ্বের ঐক্যকেই বাধাগ্রস্ত করবে। আর সেটা আপামর বিশ্ব মুসলিম ঐক্য মূলেই করাঘাত করবে।
এই খসড়া প্রস্তাবটি যেহেতু এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি হয়তো আগামী বৈঠকে তা সম্পন্ন হবে, এর মধ্যে মুসলিম বিশ্ব তথা আরব বিশ্ব দেশগুলোর ব্যাপক স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়ক পরিকল্পনা খসড়া যেন চূড়ান্ত হয় তা হতে পারে। উক্ত দেশগুলোর সামরিক প্রধানদের নিয়ে বৈঠক, রাজনৈতিক প্রধানদের নিয়ে বৈঠক, অর্থনৈতিক প্রধানদের নিয়ে বৈঠক, কূটনৈতিক প্রধানদের নিয়ে বৈঠক, সর্বোপরি একটি ব্যাপক স্বার্থ সংরক্ষণমূলক জোটের অভ্যুত্থানের আশা নিয়ে এই জোট গঠনের অন্যতম সহায়ক নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালনকারী সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সউদ আল ফয়সল আন্তর্জাতিক বিশ্বে নেতৃত্ব দানকারী ভূমিকার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত এবং এই জোটও তাদেরই উন্নয়ননির্ভর ফল। যা বিশ্ব শান্তি-শৃক্মখলা সৌহার্দ্য রক্ষা ও হানাহানি সন্ত্রাস সর্বোপরি জাতিগত দ্বনদ্ব নিরসনে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। এর জন্য প্রয়োজন ঐক্যশক্তির উদ্বোধন। ঐক্যের জয়গান এবং যে কোন মূল্যে ঐক্যের অক্ষুণ্ণতা বজায় রাখার অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া। এতেই আপাত দৃষ্টিতে মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ অনেকাংশেই সংরক্ষিত হবে। আরব বিশ্বে শত্রু শক্তির হস্তক্ষেপের মাত্রা আরো কমে আসবে এবং নিজ নিজ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আরো ক্ষমতা বাড়বে। মোটকথা, আশা করা যায়, বিশ্বের বুকে এই জোটটি জাতিসংঘের পরে অন্যতম শক্তিশালী জোটের ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান বাংলাদেশ এ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজ সোসাইটি ঢাকা-বাংলাদেশ। menamulhaq33@yahoo.com

ন্যাটো : সত্যিকারের এক আগ্রাসী সামরিক জোট


॥ গোলাপ মুনীর ॥


নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন। সমধিক সুপরিচিত ন্যাটো (NATO) নামে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক ও সামরিক জোট। এর জন্ম হয়েছিল আজ থেকে ৬৩ বছর আগে। গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শেষে দিকে এর ২৫তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শিকাগো শহরে। এই সম্মেলন অনুষ্ঠানের সময় ন্যাটোবিরোধী হাজার হাজার মানুষ সম্মেলনস্থলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় হাজার হাজার যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারী সম্মেলনস্থলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে, পুলিশ তাদের মাঝ পথে থামিয়ে দেয়। কিন্তু একটি গ্রুপ পুলিশের সাথে দাঙ্গায় লিপ্ত হয়। পুলিশ বলেছে, বিক্ষোভে আড়াই থেকে তিন হাজার লোক অংশ নেয়। এদের নেতৃত্ব দেন আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ-ফেরত প্রবীণেরা। পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতারও করে। বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমনের বিষয়টি বিশ্বের অনেক দেশের গণমাধ্যমে প্রবল সমালোচিত হয়। কিন্তু স্নায়ুদ্ধের সময়ে গড়ে ওঠা এই সংস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নই থেকে যায় বিশ্ববাসীর আড়ালে। কিংবা বলা যায়, এসব প্রশ্ন হয় থেকে যায় অবহেলিত, নয়তো সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়।
কোল্ড ওয়ার অর্থোডক্সি মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও এর আরো ১১টি মিত্র দেশ ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গড়ে তোলে ইস্টার্ন ব্লকের ওপর সোভিয়েত আগ্রাসন ও প্রভাব প্রতিহত করার জন্য। তখন বলা হলো, ন্যাটো হচ্ছে একটি আত্মরক্ষামূলক সামরিক জোট। যদি তাই হয়, তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কেন ‘মিশন অ্যাকমপ্লিসড’ ঘোষণা দিয়ে ন্যাটো জোট ভেঙে দেয়া হলো না? ব্রাসেলসের আমলারা ন্যাটো ভেঙে না দিয়ে বরং তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে ন্যাটোকে খাপ খাওয়ানোর জন্য ন্যাটোর মিশন আরো সম্প্রসারিত করেন। তখন বলা হলো, ন্যাটোর সম্প্রসারিত মিশন হচ্ছেÑ ‘শান্তি’ ও ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করাসহ সঙ্কট মোকাবেলা। এ ধরনের অস্পষ্ট ‘মিশন স্টেটমেন্ট’ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট কার্যত বিশ্বের যেকোনো দেশে, যেকোনো স্থানে যখন ইচ্ছা হস্তক্ষেপ করার পথটিই সুগম করল। এর সূত্র ধরেই আমরা ন্যাটোর উপস্থিতি দেখছি আফগানিস্তান, কসোভো, উত্তর আফ্রিকা ও সোমালিয়ায়। তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে অন্য দেশে ন্যাটোর আগ্রাসনকে আরো যৌক্তিক করে তোলা হয়েছে। নয়-এগারোর সন্ত্রাসী হামলার কয়েক দিন পর ন্যাটোর সনদে অনুচ্ছেদ ৫ সংযোজন করে। এ অনুচ্ছেদে ঘোষণা দেয়া হয়, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগান আগ্রাসনের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়, যেখানে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর অংশ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ন্যাটোর উপযোগিতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে। ২৮ সদস্যবিশিষ্ট ন্যাটোর নামে আজ যা করা হচ্ছে, তা কার্যত করা হচ্ছে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই। আমেরিকান বিদেশনীতিকে এড়িয়ে কংগ্রেসকে এড়িয়ে ন্যাটোকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা অনেক কিছু করে যাচ্ছেন। বিল কিনটনের সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৯ সালের অঘোষিত ও অবৈধ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ন্যাটোর ছত্রছায়ায়। একইভাবে বারাক ওবামা লিবিয়ার সরকার পতনের অভিযানে ন্যাটোকে ব্যবহার করেন। 
ন্যাটোকে ভেঙে না দেয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের প্রভাব। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো অস্ত্র কেনা ব্যবস্থার আওতায় কোটি কোটি ডলার তাদের দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠাচ্ছে। সেজন্য অস্ত্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী সময়েও ন্যাটোর সম্প্রসারণে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৬। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর এর সদস্য সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে তা ২৮-এ উন্নীত করা হয়। এ সম্প্রসারণের ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নেতৃত্বাধীন ওয়ারশো জোটের সদস্য দেশগুলোও অংশ নেয়। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুনিয়া); সাবেক দুই যুগোস্লাভ প্রজাতন্ত্র (স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া) এবং আলবেনিয়া এখন ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটো ইউক্রেন ও জর্জিয়া নিয়েও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু রাশিয়া যখন ঘোষণা দেয়, ইউক্রেন ও জর্জিয়ার ওপর ন্যাটোর হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না, তখন সেখানে ন্যাটোর কর্মতৎপরতা থামানো হয়।
ন্যাটোর ঘোষিত মিশন হচ্ছেÑ ইউরোপে শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন। কিন্তু ১৯৯৯ সালের পর এর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ হচ্ছে চরম উত্তেজনা সৃষ্টিকর। এর ফলে রাশিয়ার সাথে এর উত্তেজনাকর বিরোধ ব্যাপক বাড়িয়ে তুলেছে। ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ন্যাটো সদস্যগুলোতে সামরিক শক্তি ও বিশাল বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে রাশিয়া ২০০৭ সালে বাতিল করে দেয় ‘ট্রিটি অন কনভেনশনাল আর্মড ফোর্সেস ইন ইউরোপ’। ন্যাটোই ২০০৮ সালে জর্জিয়াকে রাশিয়ার সাথে সামরিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করে।
আসলে ন্যাটো গড়ে তোলার সময়ে ইউরোপে সে পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল, তাতে ধরেই নেয়া হয়েছিল, সেখানে জোটবদ্ধ যুদ্ধই হবে পরিণতি। ইতিহাসবিদ রাফল রাইকো লিখেছেনÑ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে রাশিয়ার প্রাধান্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। রুজভেল্ট ও চার্চিলের প্রত্যাশা অনুযায়ী জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও এর ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার পর এমনটিই হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ইয়াল্টা দুই পাশ্চাত্য নেতা নীরবে পূর্ব ইউরোপের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বশ্যতা স্বীকার করে নেন, যা স্ট্যালিনের বাহিনী জয় করে নেয়। তবে তাদের শঙ্কা ছিল বেড ডিক্টেটর সে এলাকায় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে দেবে না। কারণ, স্ট্যালিনের কাছে কমিউনিস্টবিরোধী সরকার চরমভাবে অগ্রহণযোগ্য হবে। ১৯৪৫ সালে স্ট্যালিন ঘোষণা দেন, তার বাহিনী যত দূর সম্ভব ভূখণ্ড দখল করবে, সেখানে তার সামাজিক ব্যবস্থা কায়েম করা হবে।
স্নায়ুযুদ্ধ প্রবলভাবে সূত্রপাত হওয়ার সময় ক্ষমতার ভারসাম্য জোরালোভাবেই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে অনুকূলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রাধান্য অভাবনীয় ও অভূতপূর্বভাবে বেড়ে যায়। অন্য দিকে রাশিয়া নাৎসি জার্মানির সাথে লড়াই করে দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে আরেকটি যুদ্ধে লড়ার মতো অবস্থা রাশিয়ার তখন ছিল না। ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল মন্টোগোমারি ১৯৪৭ সালে রাশিয়া সফর শেষে জেনারেল আইজেন হাওয়ারের কাছে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন : “The Soviet Union is very very tired. Devastation in Russia is appaling, and the country is no fit state to go to war.’’
রুশ কূটনীতিকেরা তখন অতি আগ্রহী ছিল পাশ্চাত্যের সাথে একটি চুক্তির জন্য, যাতে করে এরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। জোসেফ স্ট্যালিন নিশ্চিতভাবে অত্যাচারী শাসক ছিলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাথে কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এমনকি এই রক্তচোষা স্বৈরশাসক বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সত্যিকার রাজনীতির চর্চা করতেন। ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার লফেবার তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন : ‘তবে স্ট্যালিন তার দেশের ভেতরে খুবই সক্রিয় ছিলেন। দেশের ভেতরটা ছিল তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। ১৯৩৯-৪৬ পর্যন্ত সময়ে তিনি পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা তথা রিয়েলিজম প্রদর্শন করেন। সচেতনতার সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভ্রান্ত ছিলেন, এমন ব্যাখ্যায় যাওয়ার সুযোগ তিনি কাউকে দেননি।
স্ট্যালিন প্রত্যাশা করতেন পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাব বলয় জারি থাকুক। তার এ প্রত্যাশা ছিল যৌক্তিক। যে আগ্রাসন তার দেশকে বিধ্বস্ত করে দেয়, সে আগ্রাসন আসে বিরোধী পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকেই। তার দাবি ছিল, তুরস্ক উপকূল বরাবর সোভিয়েত জাহাজের ট্রানজিট দিতে হবে। তার মতে, এটি ছিল রাশিয়ার প্রচলিত দাবিরই পুনরুদ্ধার মাত্র। স্ট্যালিন সম্মান জানিয়েছেন গ্রিস নিয়ে চার্চিলের সাথে তার সম্পাদিত চুক্তির প্রতি। তিনি তেল-ছাড় পাওয়ার পরপর ইরান থেকে রুশ বাহিনী প্রত্যাহার করে নেন।
রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর রবার্ট টাফ্ট যুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, ‘পশ্চিম ইউরোপে রুশ আক্রমণের কোনো হুমকি নেই। আমি সোভিয়েত মনোভাব বোঝার ক্ষমতা রাখি না। তবে চার বছর ধরে মধ্য ইউরোপের বাইরে কোনো সামরিক অগ্রযাত্রার চেষ্টা প্রদর্শন করেনি রাশিয়া। আঞ্চুরিয়া তাদেরকে ইয়াল্টা বরাদ্দ দিয়েছে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ওয়ালেস সিনেটর টাফটের বিশ্লেষণ সমর্থন করে বলেছেন, রাশিয়ার যেমন লাতিন আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কিছুই করার নেই, তেমনি পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা পছন্দ করি বা না করি, রাশিয়া তার প্রভাব বলয়ের এলাকায় সমাজতন্ত্র ছড়িয়ে দিতে চাইবে, আমরা যেমনটি চাই আমাদের প্রভাব বলয়ের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান আমলে নেননি সিনেটর রবার্ট টাফট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ওয়ালেসের কথা। বরং এর বদলে তিনি আমলে নেন সিনেটর আর্থার ভেন্ডেবার্গের পরামর্শ। ভেন্ডেনবার্গ তাকে বলেছিলেন : আমেরিকান জনগণ থেকে দোজখ দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। একই সময়ে কূটনীতিক ও ইতিহাসবিদ জর্জ এফ কেনান ফরেন পলিসি পত্রিকায় একটি লেখা লেখেন। এ লেখায় ট্রুম্যানের রাশিয়ার সাথে দ্বান্দ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। ‘দ্য সোর্সেস অব সোভিয়েট কন্ডাক্ট’ শীর্ষক এ লেখায় জর্জ এফ কেনান অভিমত প্রকাশ করে বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন অতিশয় গোঁড়া সম্প্রসারণবাদী (fanatically expansonist) এবং এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংযত রাখতে হবে।’
সোভিয়েতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির মৌল উপাদান হলোÑ ধৈর্য ও সুদৃঢ়ভাবে রুশ সম্প্রসারণ প্রবণতার ব্যাপারে সচেতন থাকা, পশ্চিমা জগতের ফ্রি ইনস্টিটিউশনগুলোর ওপর রুশ চাপ সংযত করতে হবে দক্ষ প্রতিশক্তি প্রয়োগ করে। এ জন্য ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অব্যাহত পরিবর্তন আনতে হবে, সোভিয়েত নীতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। ুধার্ত রুশ ভল্লুককে খাঁচায় আবদ্ধ রাখতে হবে অবশ্যই।
সত্যটি হচ্ছেÑ ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গড়ে তোলা ছিল একটি ব্যাপকতর ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা তথা ‘ওয়াইডার জিওপলিটিক্যাল প্ল্যানের’ অংশ। আর এ পরিকল্পনা ওয়াশিংটন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক আগেই। এ পরিকল্পনা ছিল বিশ্বব্যাপী আমেরিকান রাজনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্য (World-Spanning American Political and Millitary empire) গড়ে তোলা। এমনটি জানিয়েছেন ক্রিস্টোফার লেইন তার ‘দ্য পিস অব ইলিউশনস : অ্যামেরিকান গ্রান্ড স্ট্র্যাটেজি ফ্রম ১৯৪০ টু দ্য প্রেজেন্ট’ শীর্ষক লেখায়। এ লেখায় তিনি বলেন : এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা যুদ্ধ-উত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মহাভিত রচনা করে চলেছিলেন, সে ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা হবে কর্তৃত্ববাদী।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে কমিউনিজমের ভীতি ছড়িয়ে দেয়া ছিল অপরিহার্য। কারণ তা না হলে আমেরিকান জনগণ তাদের দেশের বিদেশনীতির ব্যাপক পরিবর্তন মেনে নিত না কখনোই। সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডুলিস বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশকে এ বোঝা বহনে সক্ষম করে তোলার জন্য আমাদেরকে একটি আবেগপ্রবণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, ঠিক যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্বের মতো। কারণ ছাড়াই আমাদেরকে হুমকির ভয় ছড়িয়ে দিতে হবে।’ আর এভাবে সোভিয়েত লাল বাহিনী আর স্নায়ুযুদ্ধের ভীতিটা তখন ছড়িয়ে দেয়া হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এমনটি করা হয়েছিল নিছক আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সা থেকে। ওই উচ্চাকাক্সা আরো জোরালো করে তোলা হয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল মেমোরেন্ডাম নম্বর ৬৮-এর মাধ্যমে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলিটারি সুপ্রিমেসি’ সোভিয়েত ইউনিয়ন না থাকা অবস্থায়ও জারি রাখা হবে।
স্মরণযোগ্য, যুদ্ধ হচ্ছে ন্যাটোর একটি নিজস্ব স্থায়ী শিল্প। শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে অস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধসরঞ্জাম তৈরির পেছনে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রূপ নিয়েছে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সে। 
চল্লিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধাকেরা ভুল করে ধরে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য একটি স্থায়ী যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখা দরকার। ১৯৫০ সাল-উত্তর সময়ে উল্লিখিত ৬৮ নম্বর মেমোরেন্ডাম বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। ব্যাপক সামরিক ব্যয় এখন মার্কিন অর্থনীতির এক নিয়মিত বৈশিষ্ট্যসূচক বিষয়। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিপক্ষ শক্তি নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহসে সাহসী হয়ে উঠেছে। আর এ ক্ষেত্রে ন্যাটোকে ব্যবহার করা হচ্ছে শতভাগ। তাই বলা হচ্ছে : ‘ন্যাটো ট্রুলি ইজ অ্যান অ্যাগ্রেসিভ গ্লোবাল মিলিটারি অ্যালায়েন্স।’ 

মিসর কি গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

ক্যাথেরিন ওয়েবার
মিসরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩১ বছরের পুরনো জরুরি আইন প্রত্যাহার করেছে। ওই আইন নিরাপত্তা বাহিনীকে অসীম ক্ষমতা প্রদান করেছিল। কোনো অভিযোগ ছাড়াই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যে কাউকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পেয়েছিল। এই আইনের বলেই আরব বসন্ত চলাকালে হাজার হাজার প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকদের মধ্যে অনেকের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রতিবাদকারীদের মধ্য থেকে কতজনকে এভাবে গ্রেপ্তার কিংবা গুম করা হয়েছে? মানবাধিকার কর্মী হোসসাম বাহগাত ইসরায়েলি সংবাদ সংস্থা হারেজকে বলেছেন, এর সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। অগণিত এই সংখ্যা। এই বার্তাই বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে এমন একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। তারা মনে করত, তারা সব আইনের ঊর্ধ্বে। সেই বাহিনী এতটা উচ্ছৃঙ্খল থাকতে পারে না। তাদের নির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনবহির্ভূত যেকোনো রকম সুযোগ তারা ভোগ করতে পারে না। এই মন্তব্যকারী এবং মানবাধিকার কর্মী হোসসাম বাহগাত মিসর থেকে জরুরি আইন প্রত্যাহার করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছিলেন।
জরুরি আইন জারি হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের মৃত্যুর পর, ১৯৮১ সালে। এই আইন এর সাহায্যে তারা কোনো কারণ না দেখিয়েই যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারত। শুধু তা-ই নয়, তারা কাউকে ইচ্ছা করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলও দিতে পারত।
অসংখ্য মিসরীয় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে দিন কাটাচ্ছে এ ধরনের প্রহসনমূলক বিচারের কারণে। এদের অধিকাংশই দেখা যাবে কোনো অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত নয়। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরব বসন্তের সূত্র ধরে হাজার হাজার প্রতিবাদকারীর ভাগ্যেও একই দুর্ভোগ জুটেছে।
মিসরের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরও মানসিক নির্যাতন হয়েছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কিছু মানুষের কথা ধরা যেতে পারে। মিসরের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশই মুসলমান, মাত্র ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু। তাদের কিছু মানুষের ওপর এটি প্রয়োগ হয়েছিল।
ওয়ার্ল্ড ক্রিস্টিয়ান সলিডারিটি নামক একটি ধর্মীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের নেতা কিরি ক্যাঙ্খওয়েদ এই উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি কিন্তু বিষয়টিকে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরুর মতো বিভাজন করতে নারাজ। তাঁর মতে, এই আইন প্রত্যাহার করার কারণে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে সবার জন্যই উপকার হবে। কারণ, আইনের যে কুফল তা জাতীয়ভাবে সবাই ভোগ করেছে। তিনি বলেন, এই আইনটি করা হয়েছিল ক্ষমতা একচ্ছত্র করার জন্য। সমাজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।
তবে মিসরে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সবার জন্য তেমন কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করেনি। এই আইন সেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরই প্রয়োগ হয়েছে বেশি, যারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।
হোসনি মুবারকের পতনের পর যে সামরিক শাসকরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাঁরাও এই আইন প্রত্যাহার করার ব্যাপারে প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন। তাঁরা এখনো বলছেন, এই আইনটি পুনর্প্রবর্তনের কোনো ইচ্ছা তাঁদের নেই। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা স্পষ্টতই বলছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসা পর্যন্তই তাঁরা ক্ষমতায় থাকছেন।
সম্প্রতি মিসরের ইতিহাসে এই প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা হচ্ছে। এই নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মুহাম্মেদ মুরশি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে।
যদিও জরুরি আইন প্রত্যাহারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেছে মিসর, তার পরও আসল প্রাপ্তি নির্ভর করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওপর। যদিও নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রাথমিক স্তর হিসেবে গণ্য করা হয়। তার পরও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই নির্বাচনের পর কী ঘটে সে জন্য। আমাদের দেখতে হবে, অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকার কিভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় সেদিকেও। মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকার এলেই আমরা বলতে পারব, মিসর গণতন্ত্রের পথ ধরে কত দূর এগিয়ে যেতে পেরেছে। সেই জন্য আমাদের ১৬ ও ১৭ জুন পর্যন্ত আপাতত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, তখনই গণতন্ত্রের প্রথম ধাপে পা দেবে মিসর। অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব।

লেখক : ক্রিস্টিয়ান পোস্টের সাংবাদিক
ক্রিস্টিয়ান পোস্ট থেকে ভাষান্তর মোস্তফা হোসেইন

শনিবার, ২ জুন, ২০১২

ত্রাণকর্তা থেকে পতিত শাসক


বিবিসি
তাকে বলা হতো যুদ্ধজয়ী বীর। দেশের ত্রাণকর্তা। উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। কিন্তু ৮৪ বছর বয়সে জনতার দাবিতে আদালতের মাধ্যমে পেলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ। গত বছরের প্রথম দিকে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল (লোকসংখ্যা ৮ কোটি) এ দেশটিতে প্রবল গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। 

হোসনি মোবারককে ক্ষমতায় থাকার সময়ে ছয়বার প্রাণে মারার চেষ্টা হয়েছিল। ক্ষমতায় বসার ঠিক আগ মুহূর্তেও তার জীবন যেতে পারত। ১৯৮১ সালে কায়রোর যে সামরিক প্যারেডে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়, তিনি ছিলেন সেই মঞ্চেই ঠিক পাশে দাঁড়ানো। তিনি শপথ নিয়ে পূর্বসূরির আমলে আটক দেড় হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে মুক্ত করে দেন। 
তবে সে সময়ে কেউ ভাবেনি যে, মোবারকের শাসন এত দীর্ঘস্থায়ী হবে। তিনি জনগণের প্রতিবাদ দানা বাঁধতে দেননি। বিরোধী দল গঠন করতে দেননি। টানা তিন দশক তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। আর এ পুরো সময়েই দেশে ছিল জরুরি অবস্থা। যে কাউকে যে কোনো সময় গ্রেফতারের আদেশ দিতে পারতেন তিনি। জনগণকে সম্পূর্ণভাবে মৌলিক অধিকারবঞ্চিত রাখা হয়েছিল এ সময়ে। তার যুক্তি ছিল ইসলামী জঙ্গিদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে এর বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ভয় ছিল, সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব শুরু হয় তার ঢেউ মিসরেও আছড়ে পড়বে। কিন্তু হোসনি মোবারক সেটা ঘটতে দেননি। তিনি একদিকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমন করেন, পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে তার শাসনামলেই আরব বিশ্বের নেতৃত্বের অবস্থান থেকে মিসরকে হটে যেতে হয়। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব এবং আরও কয়েকটি দেশ সামনের কাতারে চলে আসে। 
হোসনি মোবারকের জন্ম ১৯২৮ সালে। ১৯৫০ সালে তিনি বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের যুদ্ধে তিনি বিমানবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। মিসরবাসীর বিশ্বাস, এ যুদ্ধে তাদেরই জয় হয়েছে এবং এর কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার হোসনি মোবারক। তার স্ত্রী সুজানে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। জীবনে মোবারক ধূমপান করেননি, মদ ছুঁয়ে দেখেননি। সুস্থ-সবল জীবন ছিল তার। প্রতিদিন সকাল ৬টায় ব্যস্ত জীবন শুরু হতো তার। জিমনেশিয়ামে যেতেন রুটিন করে। এক রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর রুটিন করেই তিনি দেশে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেন। এ নির্বাচনে তার কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী থাকত না। একটি মাত্র নাম থাকত ব্যালট পেপারে এবং 'সব ভোটার তাকে ভোট দিত'। তবে চতুর্থবারের নির্বাচনে (২০০৫) তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নেন। ৮৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তার জয়ী হতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি সব ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখেছিলেন। তিন দশক আগে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু নিজের শাসনামলে কাউকে এ পদে নিয়োগ দেননি। তার শাসনের শেষের দিকে জনমনে ধারণা হয়, পুত্র জামাল মোবারককে পররর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। জামাল ক্রমে দলের সর্বময় কর্তৃত্ব হাতে নেওয়ায় এ ধারণা জোরালো হতে থাকে। হোসনি মোবারক বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আজীবন তিনি দেশের সেবা করে যেতে চান। জনসাধারণ এটাকে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট থাকার অভিলাষ হিসেবেই দেখত। তিনি ১০০ ভাগ ভোটে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তার প্রতি জনগণের সমর্থন যে আদৌ ছিল না, তার প্রমাণ ছিল গত বছর মিসরজুড়ে বিক্ষোভের ঘটনা। তিনি মিসর ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছেন। কিন্তু এ সম্পর্ক তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
তিনি ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করেন। আবাসন খাতের চিত্র দেখে অনেকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপক বেকারত্বের চিত্র ভিন্ন মিসরের কথা বলে। দেশটিতে বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখ। তার শাসনামলে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে দেশের সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। গ্গ্নোবাল কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট করাপশনের রিপোর্টে মিসরকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। 
সংবাদপত্র, থিয়েটার ও সিনেমায় যাতে কোনোভাবেই ভিন্ন মতের প্রতিফলন না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সদাসতর্ক। জনস্বার্থের ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত থাকার জন্য সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো নিয়মিত। সরকারের সমালোচনা করার অধিকার কারও ছিল না। আল দুস্তোর সংবাদপত্রের সম্পাদক ইব্রাহিম ইশা বলেন, মিসরে সাংবাদিকরা থাকেন কারাগারে আর ব্যবসায়ীরা মুক্ত জীবনে। 
হোসনি মোবারকের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। আদালতে হাজিরা দিতেন স্ট্রেচারে করে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সময়কাল তার জন্য কতটা দীর্ঘায়িত হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

স সূত্র : বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমস

নতুন ইতিহাস গড়ল তাহরির স্কয়ার


সুভাষ সাহা
তিউনিসিয়ায় তখন গণরোষে পুড়ছে এক স্বৈরাচারের সিংহাসন। নির্যাতন-হত্যা, বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া, মিথ্যা প্রচার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ঢালাও প্রতিশ্রুতিতেও মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করা যায়নি। অবশেষে দেশ ছেড়ে সৌদি আরব পালাতে বাধ্য হলেন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলী। তিউনিসিয়ায় গণআন্দোলনের প্রজ্বলিত অগি্নশিখায় নিজেদের চিনে নিতে চাইল মিসরবাসী। তারা ভাবল, আমরা কম কিসে! তাই কায়রোর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত তাহরির স্কয়ার ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে হয়ে উঠতে লাগল স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গমস্থলে। কে বাম, কে ডান বা কে মধ্যপন্থি_ এসব ভেদরেখা মুছে গিয়ে তাহরির স্কয়ারে সমবেত জনসমুদ্রের স্বৈরাচারী হোসনি মোবারক সরকারের পতন এবং মুক্তি হয়ে দাঁড়াল আরাধ্য। তারা গণতন্ত্রকে তাদের মুক্তির সোপান করতে চাইল। কিন্তু জনতার এই উদগ্র ইচ্ছার মূল্য দিতে রাজি ছিল না মোবারক ও তাকে শিখণ্ডী করে বেড়ে ওঠা সেখানকার লুটেরা-হারমাদের দল। আন্দোলনের প্রথম আট দিনেই নিহত হলো ৩০০ আন্দোলনকারী। এরপর আরও কত মানুষকে জীবন বিলিয়ে দিতে হয়েছে তার হিসাব করা সত্যিই কঠিন। সে সময় আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম সেনাবাহিনীকে নামতে দেখা গেল। আর প্রাইভেট বাহিনী ও সাদা পোশাকের নিরাপত্তা কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী তো ছিলই।
৩০ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা মোবারক প্রথমে অত্যাচার-নির্যাতনের সনাতনী পন্থায় আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলেন। এতে আন্দোলনের দীপশিখা আরও লাল হলো। লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হতে লাগল তাহরির স্কয়ার ছাড়িয়ে আলেকজান্দ্রিয়াসহ প্রতিটি শহরে। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন পুরুষদের পাশাপাশি সন্তান কোলে মহিলাদেরও দেখা গেল মুক্তির মিছিলে। তাহরির স্কয়ারে অনেক নারী সংসার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আরব দুনিয়ায় সেটা ছিল অবিশ্বাস্য এক মহামমিলন। একই আন্দোলনে নারীরাও তাদের মুক্তির দিশা খুঁজছিলেন।
মোবারক ২০১১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া এবং আগামী নির্বাচনে তিনি বা তার ছেলে কেউ প্রার্থী হবেন না বলে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর দ্বিতীয় দফার ভাষণে (২ ফেব্রুয়ারি) ঘোষণা করলেন। কিন্তু ততদিনে আন্দোলন এক দফায় পরিণত হয়েছে। মোবারককে ক্ষমতায় রেখে আন্দোলনকারীরা কোনো অবস্থাতেই ঘরে ফিরতে রাজি ছিলেন না। আন্দোলনের তেজ দেখে জাতিসংঘ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান এল বারাদি পর্যন্ত হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তবে প্রচণ্ড মার্কিনঘেঁষা বলে তাকে মিসরের সাধারণ মানুষ কখনও তেমন আস্থায় নিতে পারেনি।
বস্তুত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা তিউনিসিয়া, মিসর ও ইয়েমেনের মতো আরব দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছিল। তার ওপর এসব দেশে দশকের পর দশক ধরে চলা স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে মানুষ অস্থির হয়ে উঠেছিল। কোথাও গণতন্ত্রের লেশমাত্রও ছিল না। অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে শাসন-প্রশাসনের প্রতি মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। আবার এরাই রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী। তাই প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে স্বদেশীয় ও বিদেশি তরুণ সমাজের সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল এবং হচ্ছিল বিদ্যুৎগতিতে। এতে ভীত হয়ে মোবারক সরকার এসব ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ার সমালোচনার মুখে এসব ব্যবহার তাকে অবারিত রাখতে হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ সালেই মিসরে এক লাখ ৬০ হাজার ব্লগার ছিলেন। এই ব্লগাররা বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান। এভাবেই তিউনিসিয়ার গণজাগরণ তাহরির স্কয়ার হয়ে মিসরকেও একসময় উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত করল।
আন্দোলনের গতিবেগ এত দ্রুত ছিল যে, বিশ্বের প্রধান মোড়লের পক্ষেও তার পরিমাপ করা তখন সম্ভব হয়নি। সে কারণে আন্দোলনের প্রথম দিকে মার্কিন প্রশাসনের কাউকে কাউকে বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারিকে মেবারক সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের শক্তির তোড় দেখে ওবামা নিজে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে মোবারককে ট্রানজিশনের পরামর্শ দিতে দেখা গেছে। তাদের এ দোটানা মনোভাবের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আরবের আন্দোলনকারী জনতার সন্দেহ-অবিশ্বাস আরও ঘনীভূত হয়, যার রেশ এখনও বিদ্যমান।
আসলে পশ্চিমা দুনিয়ার এহেন মনোভাবের কারণও ছিল। তারা চেয়েছিলেন সেখানে নিয়ন্ত্রিত আন্দোলনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সংস্কার। নির্বাচনের ধারায় আস্তে আস্তে আরবের লৌহযবনিকাকে একটু একটু করে সরানো। কিন্তু জনতার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের কোনো বাঁধন মানেনি। গণআন্দোলনের তোড়ে তাদের পরিকল্পনাকে তাই অদল-বদল করতে হয়েছে। তবে বছরে ২০০ কোটি ডলার নগদ মার্কিন ঋণ ও মঞ্জুরির বিরাট অংশ ভোগকারী মোটাসোটা মিসরীয় সেনাবাহিনী চরম মুহূর্তেও মার্কিন ডিক্টেশনকে অমান্য করেনি। আন্দোলনের ভয়ে যখন পর্যটন শহর শার্ম-আল শেখে মোবারক লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান, তখনও এই সেনাবাহিনী একটার পর একটা বিকল্প হাজির করে জনমতকে বিভ্রান্তের চেষ্টা করেছে। তারা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে না বলে তাদের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতায় থাকা আর সম্ভব হবে না বিবেচনা করেই তারা নির্বাচনে কারসাজির মাধ্যমে সেখানে প্রগতিশীল শক্তির উত্থানকে আটকাতে চেষ্টা করছে। তারা তাদের ও পশ্চিমা সমর্থিত শক্তি এবং ইসলামী শাসনে বিশ্বাসী ইসলামী ব্রাদারহুডের মধ্যে দেশকে বিভাজিত করার চেষ্টা করছে।
আবার মিসরের বিপ্লবের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যাক। মানুষের সুদীর্ঘকালের অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনা ও স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া ক্ষোভ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাতের সঙ্গে মিলে মহবিদ্রোহের তরঙ্গমালায় রূপান্তরিত হয়েছিল, যাকে এককথায় 'আরব বসন্ত' অভিধায় অভিহিত করা হয়। মিসরে এ বিপ্লব ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি শুরু হয়ে মাত্র ১৮ দিনের মাথায় হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের যবনিকাপাত ঘটাল। সে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা। ১১ ফেব্রুয়ারি মোবারকের ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা যখন আসে, তখন তাহরির স্কয়ারে বিনিদ্র রাত কাটানো মানুষের সে কী বিজয় উল্লাস!
আর সে বিজয়কে গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারে পরিণত করার জন্য এরপর সামরিক বাহিনীর একের পর এক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষের লড়ে যাওয়া এবং বারবার তাহরির স্কয়ারে জড়ো হওয়া মিসরের জনগণের বিরাট অংশের সচেতনতার মান এক লাফে অনেক ওপরে উঠে যাওয়ার সাক্ষ্য বহন করে।
মিসর-বিপ্লব বস্তুত জনতার সম্মিলিত শক্তি যে অপরাজেয় তাই প্রমাণ করে। তবে বিপ্লবে বিজয়ী হওয়া আর ওই বিজয়কে ধরে রাখতে পারাটার মধ্যে যে যোজন যোজন ব্যবধান রয়েছে সে সম্পর্কেও আমাদের রাজনৈতিক জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনে সাহায্য করবে এটা।

স সুভাষ সাহা :সাংবাদিক