মঙ্গলবার, ১২ জুন, ২০১২

রাজনীতির নোংরা খেলায় ব্রাদারহুড কি হেরে যাবে?


॥ এরিক এস মারগোলিস ॥


মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ও সিদ্ধান্তকারী পর্যায়ের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৬ ও ১৭ জুন। সাবেক জেনারেল ও মোবারক সরকারের একটি স্তম্ভ আহমদ শফিক নির্বাচনে যেকোনোভাবে জয়লাভ করলে অবশ্যই এটা নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। মিসরে খুব সম্ভবত গণবিস্ফোরণ আসন্ন। ইতোমধ্যে মিসরবাসী অত্যন্ত ক্ষিপ্ত ও ুব্ধ হয়েছে যে, তাদের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামরিক জান্তার হাতের পুতুল রাষ্ট্রীয় নির্বাচন কমিশন বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন কমিশন মিথ্যা কারণ দেখিয়ে অনেক জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য ভেটো প্রয়োগ করেছে। এভাবে নির্বাচনকে এগিয়ে আনা হয়েছে। ইসলামপন্থীদের ভোটকে বিভাজনের ব্যবস্থা করে মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি ও সাবেক মেজর জেনারেল আহমদ শফিকের মধ্যে রান-অফ ভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
২০১১ সালের শেষের দিকে মিসরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং ২০১২ সালের প্রথম দিকে এই নির্বাচন শেষ হয়। পার্লামেন্ট নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনের ফলাফল ছিল পশ্চিমা মিডিয়ার জন্য বিস্ময়কর। পশ্চিমা মিডিয়া মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে নিয়মিতভাবে মিথ্যাচার করে আসছিল। নির্বাচনে ইসলামপন্থী ব্রাদারহুড এবং সালাফিপন্থী আল নুর পার্টি জনমনের ভোটের ৬৬ শতাংশ অর্জন করতে সক্ষম হয়। নির্বাচনে প্রতি তিনজন মিসরবাসীর দুইজনই ইসলামি নীতির অনুসারী দলগুলোর পক্ষে ভোট দেয়। মিসরের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর আর্থিক আনুকূল্যে এবং কিছু রক্ষণশীল আরব মিত্রের মাধ্যমে ইসলামপন্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। এরপর মোবারক সরকারের পক্ষের লোকদের চাঙ্গা করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ইসলামপন্থীদের জন্য দুরূহ করে তোলা হয়। প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে বিশেষত পুরনো মোবারক আমলের মতোই সুস্পষ্টভাবে ভোট কারচুপির মাধ্যমে কলঙ্কিত করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর প্রার্থী আহমদ শফিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা যেসব জেলায় বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছিল, সেসব জেলায় সহজে জয় লাভ করেছেন। ইসলামপন্থীরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে থাকা খ্রিষ্টানদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্লেখ্য, খ্রিষ্টানরা মিসরের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ। ইসলামপন্থীরা যে খ্রিষ্টানদের জন্য কোনো হুমকি নয় অথবা সালাফিদের নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে না, সেটা তারা বোঝাতে পারেননি। তারা যে গণতন্ত্রের প্রশ্নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অথবা যুবসমাজের প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সেটা যথেষ্ট জোর দিয়ে উল্লেখ করতে পারেনি।
অন্য একটা প্রধান ফ্যাক্টর যেটা আমি গোটা মিসরে প্রত্যক্ষ করেছি সেটা হচ্ছেÑ রাস্তাঘাট থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করার ব্যাপারে সামরিক জান্তার কূটচাল। পুলিশ প্রত্যাহারের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের অন্যতম অপরাধমুক্ত দেশটিকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছে। অথচ দারিদ্র্য সত্ত্বেও দেশটি অপরাধমুক্ত ছিল। শফিককে সমর্থনের মাধ্যমে এবং তার প্রতি সমর্থন দানকারী সামরিক বাহিনী যারা কঠোর হস্তে অপরাধ দমনের কথা বলেন, তাদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমবর্ধমান হারে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মিসরের অনেক নাগরিক ভীত শঙ্কিত হয়ে পড়ছে। এমনকি সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালিয়ে এটা বোঝানো হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দৌড়ে ইসলামপন্থী মুরসির প্রায় সমানে সমান হচ্ছেন শফিক। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, শফিক জয় লাভ করলে মিসরের ঘৃণিত সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ওমর সুলাইমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। শফিকের জয়লাভ করার অর্থ হচ্ছেÑ মোবারক ছাড়াই পরিপূর্ণভাবে ‘মোবারকবাদ’ ফিরে আসা।
মিসর তার বিপ্লবকে সঠিকভাবে প্রদর্শন করতে পারেনি। তাই মোবারক আমলের স্বৈরাচার এবং হিংস্র পুলিশি রাষ্ট্র আবার ফিরে আসতে পারে। পরিস্থিতি সে দিকে চলে গেলে মোবারককে ঘিরে থাকা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও একান্ত সহচররা আবার দেশের অর্থনীতি লুণ্ঠন করতে পারে অথবা মিসর যুক্তরাষ্ট্রের, পরোক্ষভাবে ইসরাইলের ক্রীড়নকে পরিণত হতে পারে। 
প্রকৃতপক্ষে, মিসরের ইসলামপন্থী জাতীয়তাবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ২০০ কোটি ডলার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা কিভাবে পেতে পারেন, অথবা এই সহায়তা ছাড়া তারা চলতে পারবে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ড. মুরসিকে অবশ্যই জনপ্রিয় নাসেরপন্থী হামদিন সাবাহিকে তার প্রধানমন্ত্রী এবং কপ্টিক খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নেয়ার অঙ্গীকার করতে হবে। সঙ্কটে পড়লে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা চাইতে হবে। ওয়াশিংটন গভীর উৎকণ্ঠিত যে, ব্রাদারহুড ইসরাইলের সাথে ১৯৭৯ সালে স্বাক্ষরিত ঘৃণ্য ও একপক্ষীয় বা একতরফা ক্যা¤প ডেভিড চুক্তি বাতিল করে দিতে পারে। মিসরের বেশির ভাগ নাগরিক চুক্তিটিকে সঠিক অর্থেই বাতিল হিসেবে দেখছে, কারণ ইসরাইল চুক্তিটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
ওই চুক্তিতে পশ্চিমতীর থেকে ইসরাইলি প্রত্যাহার এবং একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্ত ছিল। কিন্তু চলতি বছরটা মার্কিন নির্বাচনী বছর হওয়ায় মিসরের জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থীরা অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক। নির্বাচন উপলক্ষে ইসরাইলপন্থী শক্তি রিপাবলিকান পার্টিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, তরুণ মিসরীয়রা ব্রাদারহুডকে তাদের ‘দাদাদের পার্টি’ হিসেবে গণ্য করে থাকে। তারা ব্রাদারহুডের সদস্যদের এবং বহু শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলীকে রক্ষণশীল বলে মনে করে। রাজনীতির নোংরা খেলায় ব্রাদারহুডের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু মিসরের সামনের নির্বাচনে আহমদ শফিক এবং সামরিক বাহিনীর জয় হলে মিসরবাসী দেশটির আমূল পরিবর্তনের জন্য আবার তাহরির স্কয়ারে প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ শুরু করতে পারে। গণবিস্ফোরণ শুরু হলে তা অত্যন্ত মারাত্মক ও বিপজ্জনক হতে পারে। হ
লেখক : পুরস্কার বিজয়ী আন্তর্জাতিক কলামিস্ট, আইএইচটি, লস এঞ্জেলেল টাইমস, টাইমস অব লন্ডন, গালফ টাইমস, খালিজ টাইমসে তার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়ে থাকে। সিএনএন, বিবিসি, ফ্রান্স-২ ফ্রান্স-২৪, ফক্স নিউজ, সিটিভি এবং সিবিসিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশ্লেষক। পাকিস্তানের দ্য নেশন পত্রিকা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন